Thursday, 1 August 2019

প্রবন্ধঃ বর্তমান প্রেক্ষাপটে ইসলামী রাজনীতি ও তাকওয়ার গুরুত্ব

মুহাম্মদ জামাল উদ্দীন রব্বানী

ভূমিকা
ইসলামে রাজনীতি ও রাজনীতিতে তাকওয়া বর্তমান প্রেক্ষাপটে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। বর্তমান দুনিয়ায় ‘ইকামতে দীন’ তথা আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠার বদলে অসংখ্য মানবগড়া সংগঠন বা মতবাদ গড়ে তুলে যেমন নিজেদের খেয়াল-খুশিমত আইন-কানুন, বিধি-বিধান প্রতিষ্ঠা করে রাষ্ট্র পরিচালনায় ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে, তেমনি তাকওয়াবিহীন ইসলামী রাজনীতিও ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে। তাই আল্লাহর দুনিয়ায় ইকামতে দীন কায়েমে তাকওয়াভিত্তিক কল্যাণকর সফল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা বর্তমান সময়ের অনস্বীকার্য দাবী। নামাযের জন্য যেমন ওযু শর্ত, রাজনীতির জন্য তেমন তাকওয়া শর্ত। শুধু ওযু করলে যেমন নামায আদায় হবেনা, তেমনি ইসলামী শরিয়ত ব্যতিত রাজনীতিও সফল হবেনা।

ইসলামে রাজনীতি 
ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা। এটি কোন নিছক ধর্ম নয়। ইসলাম মানবজীবনের প্রতিটি বিভাগের সুসামঞ্জস্যপূর্ণ একটি প্যাকেজের নাম। এখানে এর কোনটি বাদ দেয়ার বা অবহেলার করার সুযোগ নেই। মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাদের সৃষ্টির উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলেন,

“আমি মানবজাতি ও জীন জাতিকে সৃষ্টি করেছি আমার ইবাদতের জন্য।” 
( সুরা আয-যারিয়াত : ৫৬)
এখানে ‘ইবাদত’ শব্দটি ব্যাপক অর্থবোধক। মানুষের যাবতীয় কথা, কাজ, আয়-ব্যয় ও পারস্পরিক- সম্বন্ধ, এক নির্ধারিত পন্থা এবং নিয়ম পদ্ধতি অনুযায়ী সুসম্পন্ন হওয়া অপরিহার্য। তা যদি করা হয় তাহলে আল্লাহর মানব সৃষ্ট সংক্রান্ত উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য সার্থক হতে পারে। অন্যথায় মানুষের জীবনে আল্লাহ উদ্দেশ্য পূর্ণ হতে পারে না। মানবজীবন ব্যর্থ ও নিষ্ফল হয়ে যেতে বাধ্য। 
সুতরাং আল্লাহর উদ্দেশ্য এবং মানবজীবন সফল হওয়ার জন্য প্রয়োজন আল্লাহর বিধান অনুযায়ী রাষ্ট্র গঠন তথা ইসলামী হুকুমত। নয়তো মানবজীবনও ব্যর্থ হবে, আল্লাহর উদ্দেশ্যও ব্যর্থ হবে, যেটা কাম্য নয়।
একটি কথা খুব ভালোভাবে বুঝা দরকার, যে যেই জিনিসটা তৈরী করে সে সেই জিনিসটি নিখুঁতভাবে পরিচালনা করার নিয়ম জানে। অন্য কেউ তা দক্ষতার সাথে নিখুঁতভাবে পরিচালনা করতে পারবেনা। যেহেতু এ নশ^র পৃথিবী ও তার যাবতীয় সবকিছু মহান আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন সেহেতু এ পৃথিবীতে মানুষ কিভাবে সফল ও সার্থক হবে তার দিক নির্দেশনা তিনি দিয়ে দিয়েছেন এবং আমাদের সেই দিক নির্দেশনা অনুযায়ী চলা একান্ত জরুরী। নচেৎ জীবন যাপন হবে আনাড়ি। ফলে সফলতা লাভ করাও সম্ভবপর হবেনা। মহান আল্লাহ তায়ালা এ ব্যাপারে বলেছেন ,

“ আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন, তদানুযায়ী তাদের বিচার নিষ্পত্তি কর এবং তাদেও খেয়াল-খুশির অনুসরণ কর না।” ( সুরা মায়িদা:৪৯)
এ আয়াতের দ্বারা স্পষ্ট বুঝা যায়, আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন অর্থ্যাৎ কুরআন মজীদ অনুযায়ী শাসনকার্য পরিচালনা করা আবশ্যক, নিজেদেও খেয়াল-খুশি মতো বিধান তৈরী কওে রাষ্ট্র পরিচালনা করা আল্লাহ তায়ালার হুকুমের বাইরে।
ইসলামী শাসন পরিচালনা জন্য তিনি অন্যত্র বলেছেন,

“আমি তো আপনার উপর কিতাব অবতীর্ণ করেছি যেন আপনি আল্লাহ আপনাকে যা জানিয়েছেন তদানুযায়ী মানুষের মধ্যে বিচার-মীমাংসা করতে পারেন।” (সুরা নিসা : ১০৫)
এসকল নির্দেশের পরও যারা রাষ্ট্র পরিচালনায় আল্লাহর অবতীর্ণ কিতাব তথা কুরআন মজীদের বিধান অনুসরণ করে না বরং নিজেদের খেয়াল-খুশি মতো বিধান রচনা করে তাদের সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলে দিয়েছেন,

“ আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন, তদানুযায়ী যারা বিধান দেয় না তারা কাফির।” ( সুরা মায়িদা : ৪৪)
অন্য আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, তারা ফাসিক, তারা যালিম।
তাহলে বুঝা গেল, রাষ্ট্র পরিচালনা বা রাজনৈতিক ব্যবস্থায় মানুষের মনগড়া আইন অচল। আল্লাহ তায়ালার উপর ঈমান আনলেই তাঁর বিধান মেনে চলতে হবে। তাইতো প্রত্যেক নবী-রাসুল পৃথিবীতে এসে মানবজাতিকে আল্লাহর বিধান অনুযায়ী পরিচালিত করার সংগ্রাম করেছেন। যাতে আল্লাহর যমীনে তাঁর দীন প্রতিষ্ঠিত হয় এবং তাঁর আইন এবং বিধান চালু ও কার্যকর হয়।
পবিত্র কুরআন মজীদে উল্লেখ আছে, আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছাড়াও হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম, হযরত মুসা আলাইহিস সালাম, হযরত দাউদ আলাইহিস সালাম এবং সুলাইমান আলাইহিস সালাম আল্লাহর বিধান অনুযায়ী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং তা আদর্শিক মানে পরিচালনা করেছিলেন।
নিউ ও ওল্ড টেস্টম্যান থেকে জানা যায় যে, বনী ইসরাইলের অন্যান্য নবীগণও রাষ্ট্র সংস্থা সংশোধনের চেষ্টা করেছেন এবং ভ্রান্ত নেতৃত্বেও অবাধ সামলোচনা করেছেন।
ইসলামী চিন্তাধারার রাজনীতি বা রাষ্ট্র যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা আল্লাহ তায়ালার নিম্মোক্ত বাণী থেকে বুঝা যায়। হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মক্কায় ইসলামের মিশন প্রচার করে নির্যাতিত হচ্ছিলেন তখন তিনি আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে শিখিয়ে দেয়া এ আয়াতটি বারবার পড়তেন,
  
“ বল, হে প্রতিপালক! আমাকে প্রবেশ করাও কল্যাণের সাথে এবং আমাকে নিষ্ক্রান্ত করাও কল্যাণের সাথে এবং তোমার নিকট থেকে আমাকে দানকর সাহায্যকারী।” (সুরা 
ইমাম হাসান বসরী, ইবনে কাসীর উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, “প্রভু হয় আমাকে রাষ্ট্র ক্ষমতা দান কর, আর না হয় অপর কোন রাষ্ট্রকে আমার সাহায্যকারী বানিয়ে দাও, যেন আমি তার শক্তি ও ক্ষমতার মাধ্যমে পৃথিবীর এই মহাভাংগন ও বিপর্যয়কে সংশোধন করতে পারি। অশ্লীলতা ও নাফরমানীর এই মহাপ্লাবনকে প্রতিরোধ করতে পারি এবং তোমার সুষম আইন ও বিধান চালু ও  কার্যকর করতে পারি।”
আল্লাহর বাণীকে সমুন্নত করতে, সঠিক প্রচার, প্রসার ও প্রয়োগ করতে রাষ্ট্র শক্তির যে কোন বিকল্প নেই তা অনুধাবন করেই আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হিজরত করে মদীনা শরীফ এসে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করেন, মদীন সনদ তার পরিকল্পনার একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত বহন করে।
তিনি তার পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করলেন, মুখোমুখি হলেন বিরোধী শক্তির। তবুও দীর্ঘ সংগ্রামের পর মদীনা নামক ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন।

মানবগড়া বিধান কতটা যুক্তিপূর্ণ
বর্তমানে পৃথিবীর প্রায় অধিকাংশ রাষ্ট্র পরিচালিত হচ্ছে মানবগড়া বিধান অনুযায়ী অর্থ্যাৎ মানব রচিত সংবিধান অনুযায়ী। পৃথিবীতে দু’ধরনের সংবিধান রয়েছে। লিখিত সংবিধান ও অলিখিত সংবিধান। উক্ত সংবিধানগুলো লিখিত হোক বা অলিখিত হোক প্রত্যেকটিই মানব রচিত। আর মানব রচিত এ সকল বিধি-বিধান মানুষকে  মেনে চলতে হয়। অথচ কোন মানুষ নির্দিষ্ট কোন মানুষকে অনুসরণ করা বা মেনে চলা প্রকৃতিগত, বিবেকগত এবং ইন্দ্রিয়গত কোন দিক দিয়েই যুক্তিপূর্ণ নয়।
প্রকৃতিগত; যাকে আরবীতে তরবিয়্যত বলে। প্রকৃতি বা স্বভাবগত দিক দিয়ে কোন মানুষ কোন মানুষকে অনুসরণ করতে হয়না। কেননা খাওয়া-দাওয়া, উঠা- বসা, চলা-ফেরা, হাসি-কান্না, অনুরাগ-বিরাগ, পেশাব-পায়খানা প্রভৃতি প্রাকৃতিগত এবং স্বভাবজাত বিষয়ে মানুষ কারো অনুসরণের মুখাপেক্ষী নয়। সদ্য প্রসূত শিশুও জন্মের পর হতে এ সকল কাজ করতে পারে অনায়সে। সুতরাং মানুষ যেটা নিজে নিজেই করতে পারে, সেটা কেন সে অন্য মানুষকে অনুসরণ-করে করবে?
বিবেকগত; যাকে আরবীতে আকলিয়্যত বলে। প্রত্যেক মানুষের কিছু না কিছু বিবেক বা আকল আছে। এর দ্বারা মানুষ আকলিয়্যত সম্বন্ধে জ্ঞান লাভ করতে পারে অনায়সে। এ ক্ষেত্রেও মানুষ মানুষের অনুসরণ করার প্রয়োজন পড়েনা। যেমন, দূরে কোথাও ধুঁয়া দেখে প্রত্যেক মানুষই বলতে পারবে যে সেখানে নিশ্চই আগুন লেগেছে। পদচিহ্ন দেখে বলতে পারবে কারো আগমন ঘটেছে এবং আদ্রতা দেখে বুঝতে পারবে এখানে নিশ্চই পানি পড়েছে বা পাশে কোথাও পানি আছে। সুতরাং বুঝা গেল, বিবেক-বিবেচনাগত দিক দিয়ে কোন মানুষ কোন মানুষের অনুসরণ করার দরকার নেই।
ইন্দ্রিয়গত; যাকে আরবীতে বলে হিস্যিয়্যত। ইন্দ্রিয়গত দিক দিয়েও কোন মানুষ কোন মানুষের অনুসরণ করার প্রয়োজন নেই। কেননা, চোখে দেখা, কানে শ্রবণ করা, নাকে ঘ্রাণ নেওয়া, জিহŸা দ্বারা স্বাদ গ্রহণ করা এবং ত্বক দ্বারা ঠান্ডা গরম ইত্যাদি উপলব্ধি করা প্রত্যেক মানুষেরই একই রকম। সুতরাং এখানেও কাউকে অনুসরণ করার দরকার নেই।
এখন প্রশ্ন হলো, মানুষ কাকে অনুসরণ করবে? আমরা জানি, মানুষ সৃষ্টির সেরাজীব। আশরাফুল মাখলুখাত। স্বভাবজাত জ্ঞান, আকল ও ইন্দ্রিয়ানুভূতি যেহেতু স্বল্প-বিস্তর প্রত্যেক মানুষের মধ্যেই আছে তাই এক মানুষ আরেক মানুষের মন-মগজ, চিন্তা-চেতনা থেকে উদ্ভুত আইন-কানুন, বিধি-বিধান গ্রহণ করার কথাটি শুধু অযৌক্তিকই নয়; বরং অবাস্তবও বটে। এতে বুঝা যায়, আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন অর্থ্যাৎ ‘অহী’ই হতে পারে মানুষের একমাত্র অনুসরণযোগ্য। কোন মানুষের তৈরী বিধান কোন মানুষ মানতে পারে না। আল্লাহর অবতীর্ণ বিধান অনুযায়ীই মানুষ পৃথিবীতে পরিচালিত হবে।

একটি প্রশ্ন ও তার জবাব
অনেকেই প্রশ্ন করতে পারেন, মানুষ তো নবী-রাসুলদের অনুসরণ করে থাকেন। এ ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালার এ বাণীটি যথার্থ উত্তর হতে পারে। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন,

“হে ইমানদারগণ ! তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আনুগত্য কর এবং তোমাদের মধ্যে যারা শ্রেষ্ঠ নির্দেশ দাতা তাদের আনুগত্য কর। ( সুরা নিছা : ৫৯)
অর্থ্যাৎ তোমরা তাদের আনুগত্য বা অনুসরণ করতে পারো যারা আল্লাহ তায়ালাকে অনুসরণ করেছে। আয়াতে ও-লিল আর্ম বলতে তাদের বুঝিয়েছেন যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পথ অনুসরণ করেছেন। আল্লাহর পদাঙ্ক অনুসরণকারী যে কাউকে অনুসরণ করা যাবে। কিন্তু যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পথ অনুসরণ করেনি তাদের অনুসরণ করা যাবে না। তাদের রচিত বিধান অনুসরণযোগ্য নয়।
অনেক নামধারী মুসলমান আছেন যারা নামায, রোযা, হজ্জ, যাকাতের মতো কতিপয় ইবাদত পালন করেন, কিন্তু আল্লাহর বিধান অনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালনায় রাজনৈতিক ব্যবস্থা মানেন না। তাদের ব্যাপারে রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিম্মোক্ত হাদিসটি প্রনিধানযোগ্য।
রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 

“ আমি তোমাদেরকে পাঁচটি বিষয়ের নির্দেশ দিচ্ছি, আল্লাহ আমাকে ঐগুলো নির্দেশ দিয়েছেন। (বিষয়গুলো হচ্ছে) সংগঠন, নেতার নির্দেশ শ্রবণ, নেতার নির্দেশ পালন, আল্লাহর অপছন্দনীয় সবকিছু বর্জন এবং আল্লাহর পথে জিহাদ। যেই ব্যক্তি ইসলামী সংগঠন ত্যাগ করে এক বিঘৎ পরিমাণ দূরে সরে গেছে সে নিজের গর্দান থেকে ইসলামের রশি খুলে ফেলেছে, তবে সে যদি সংগঠনে প্রত্যাবর্তন করে তো স্বতন্ত্র কথা। আর যেই ব্যক্তি জাহিলিয়্যাতের দিকে আহবান জানায় সে জাহান্নামী।” সাহাবাগণ আরজ করলেন, “ হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, সালাত কায়েম এবং সাওম পালন করা সত্তে¡ও?” আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “সালাত কায়েম, সাওম পালন এবং মুসলিম বলে দাবী করা সত্তে¡ও।” (মুসনাদে আহমদ ও হাকেম)
বুঝা গেল, নামাযা ও সাওম পালন করা মুসলিমও যদি আল্লাহর বিধান বাস্তবায়নে রাজনৈতিক ব্যবস্থা বা সংগঠনভূক্ত না হয়, ইসলামী হুকুমত কায়েমে সচেষ্ট না হয়, তাহলে সে মুসলিম জান্নাতে যেতে পারবেনা। হাদীসের দ্বারা একথাটিও স্পষ্ট হয়ে গেল, আল্লাহর বিধানের বাইরে অন্য মতবাদের (জাহিলিয়্যত) দিকে ধাবিত হলে তার স্থান হচ্ছে জাহান্নাম। আর এখানে সংগঠনের দ্বারা স্পষ্টভাবে ইসলামী রাজনীতির কথা বুঝানো হয়েছে। কারণ ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য ইসলামী রাজনীতি আবশ্যক। এটা আল্লাহ তায়ালার নির্দেশও।
আল্লাহ তায়ালা বলেছেন,  
“তোমরা সংঘবদ্ধভাবে আল্লাহর রজ্জুকে (অর্থ্যাৎ ইসলামকে) আকঁড়ে ধরো।” (সুরা ইমরান : ১০৩)
তারপরেও কি আমরা ইসলামী সংঠন বা রাজনীতি নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারি? 

মানবগড়া সংবিধান কি শান্তি দিতে পেরেছে?
বর্তমানে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমিসহ বিশে^র প্রায় দেশে মানব রচিত সংবিধান প্রচলিত আছে। প্রশ্ন হলো, এই সংবিধান কি মানব জাতিকে মুক্তি বা শান্তি দিতে পেরেছে? মোটেই না। ১৬শ শতাব্দি থেকে শুরু করে একুশ শতাব্দির বর্তমান পর্যন্ত মানব জীবনে শান্তি স্থাপনের জন্য ব্যাঙের ছাতার মতো মানব সৃষ্ট বহু মতবাদ গড়ে উঠেছে। কিন্তু এসব মতবাদ শান্তি স্থাপনের ও সমস্যা সমাধানের পরিবর্তে জীবনকে করে তুলেছে আরো সংকটময়, সমস্যাসংকুল। ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্র আর ধর্মহীন গণতন্ত্রের স্বাভাবিক পরিণতিতে উদ্ভব হয়েছে চরম নির্যাতনমূলক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা পুঁজিবাদ। এ পুঁজিবাদেও ঘোড়ার দাপটে পিষ্ট হয়েছে মানবতা, নির্যাতিত হয়েছে বঞ্চিতের দল। এখান থেকে মুক্তি পাওয়ার আশায় হেগেল ও ডারউইনের বস্তুবাদেও নির্যাস থেকে মহাত্মা কার্ল মার্কস ‘সমাজবাদ’। তার এ মতবাদে দীক্ষা নিলেন লেলিন ও স্তালিন। তারা অত্যনত আকর্ষনীয়ভাবে তুলে ধরল ব্যক্তি-মালিকানার বিরোদ্ধে যুক্তি। কিন্তু এ অবাস্তব সমাজবাদ মানব জীবনে শান্তি স্থাপনে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। তাই আজ সারা বিশে^ মানব রচিত মতবাদের যাঁতাকল থেকে মুক্তি লাভ করে খোদায়ী জীবন দর্শন ইসলামী আদর্শের বুনিয়াদে জীবন পরিচালনায় উদ্যোগ গ্রহণ করছে।

সমস্যাসংকুল বাংলাদেশ
বর্তমানে কেমন চলছে বাংলাদেশ? কিছু অন্ধ ছাড়া সবাই একবাক্যে বলবে, দেশে গভীর সংকট চলছে। নীতি-নৈতিকতা হারিয়ে রাজা-প্রজা প্রায়ই সবাই একাকার। কেউ ক্ষমতায় থাকায় লড়াই, কেউ ক্ষমতায় যাওয়ার লড়াই, আদতে দেশের মানুষের সুখ-শান্তি তাদের কারোই কাম্য নয়। বর্তমান সরকার কেমন করে ক্ষমতায় এসেছে, বিশেষ করে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারীর নির্বাচন কেমন হয়েছে, তা সচেতন জনগণ মাত্রই জানেন। যে সংবিধানকে তারা ধর্মগ্রন্থের চেয়েও বড় মনে করে, সেটার উপর ১৬ বার ছুরি চালিয়েছে, কিন্তু শান্তি খোঁজে পাইনি। ক্ষমতায় যে যায় সংবিধান তার। সে তার মতো করে সংবিধান সংশোধন করে। এতো সংশোধন-সংযোজন তবুও দেশের মানুষ মুক্তি পাইনি। মেলেনি সোনার হরিণ শান্তিও। শান্তি মেলবে বলে মনেও হয়না। মানুষ এখন বুঝে গেছে, এ সংবিধান নাগরিকদের জন্য নয়, নয় শান্তির জন্যও। এটা কেবল গণতন্ত্রের ধ্বজাধারীদের।

রাজনীতিতে তাকওয়া
এতো অশান্তির মূল কারণ মানবগড়া সংগঠন। পুঁজিবাদ, সমাজবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ বা গণতন্ত্র এসব কিছু মাকাল ফল। কভার আকর্ষণীয়, ভেতরে অন্তসারশূণ্য। কেননা যে সংবিধানে মানুষ মানুষের কাছে জবাবদীহিতার শৃংখলে বন্দি, যেখানে মানুষই সকল ক্ষমতার উৎস, সেখানে ক্ষমতার জোরই প্রাধান্য বিস্তার করবে। এটা যুগে যুগে প্রমাণিত হয়ে আসছে। যদি সবকিছুতে মহা ক্ষমতারধর সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর ভয় থাকত, দুনিয়ার কৃতকর্মের হিসাব পরকালে মহাবিচারক আল্লাহর কাছে দেয়ার বিশ^াস থাকত, সকল ক্ষমতার মালিক মহান আল্লাহকে বলে জানত, তাহলে মানুষে মানুষে ক্ষমতার এত লড়াই চলত না। মানুষ মানুষকে শোষণ করা মহোৎসব চলত না। মানুষের গড়া আইন দিয়ে কখনো মানুষকে শৃংখলিত করা যায়না। এ ক্ষেত্রে আল্লাহর আইন মানব জাতিকে মুক্তি দিত নয়, মানবজাতির শাসকদের করত আল্লাহর প্রতি ভীত। মহান আল্লাহ বলেছেন.

“ তোমরা সর্বদা মহান আল্লাহকে ভয় করতে থাক। কারণ তিনি তোমাদের প্রতিটি নেক আমল ও অন্যায় ক্রিয়াকলাপ সম্পর্কে সম্যক অবগত।” (সুরা হাশর: ১৮)
ইসলামী শাসকরা আল্লাহকে ভয় করে যাবতীয় পাপাচার থেকে নিজেরা যেমন দূরে থাকত, তেমনি দেশ পরিচালনায় প্রজাদের অধিকার সম্পর্কে সতর্ক থাকত এবং অন্যায় কর্মকান্ড থেকে বিরত থাকত।
দ্বিতীয় খলিফা হযরত ওমর রাদ্বিআল্লাহু তায়াল আনহু একটি ঘটনা। তিনি রাষ্ট্রীয় কাজে জেরুজালেম যাচ্ছিলেন, প্রখর সূর্যতাপে মরুভূমির বালুকণা উত্তপ্ত। তাঁর বাহন ছিল একটি উট আর সঙ্গী ছিল একজন ক্রীতদাস। তিনি জেরুজালেম যাওয়ার পথে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার সময় কখনো তিনি উটের পিঠে চড়তেন, কখনো তাঁর ক্রীতদাসকে উটের পিঠে বসিয়ে তিনি উঠের লাগাম ধরতেন। কারণ তাঁর কাছে আল্লাহর ভয় ছিল যে, শুধু তিনিই যদি উঠের পিঠে চড়েন ক্রীতদাসকে লাগাম টানতে দেন তাহলে সেট অমানবিক হবে। এটার জন্য কাল কিয়ামতের ময়দানে মহান আল্লাহর কাছে জবাবদীহি করতে হবে। 
বর্ণিত আছে, আমিরুল মোমেনিন হযরত ওমর রাদ্বি আল্লাহু আনহু মহান আল্লাহর ভয়ে মাঝে মাঝে মাটিতে ঢলে পড়তেন। 
ইসলামের প্রথম খলিফা হযরত আবু বকর ছিদ্দীক রাদ্বি আল্লাহু আনহু যখন নবীজির বেসাল শরীফের পর ইসলামী দুনিয়ার খেলাপতের দায়িত্ব নিলেন, তখন তাকে রাষ্ট্রের কাজ করতে করতে তাঁর নিজের ব্যবসা বাণিজ্য বন্ধ করে দিতে হয়। ফলে তার পরিবারে অনেক সময় উপোস থাকতে হয়। সাহাবায়ে কেরামগণ ওনাকে বায়তুল মাল থেকে সামান্য ভাতার ব্যবস্থা করতে চাইলে তিনি নারাজ হন। পরবর্তীতে সাহাবাদের অনুরোধে বায়তুল মাল থেকে তাঁর পরিবারে ঐ পরিমাণ আটা পাঠানোর ব্যবস্থা করা যা দিয়ে রুটি বানিয়ে খাওয়া যায়। একদিন খলিফার স্ত্রী তাকে খুবই কাতর সুরে বললেন, হযরত ! বায়তুল মাল থেকে যে পরিমাণ আটা দেয়া হয় তা দিয়ে আপনাকে শুধু শুকনো রুটি বানিয়ে দিতে পারি। আপনি বায়তুল মালের দ্বার রক্ষককে যদি বলতেন, সামান্য আটা বাড়িয়ে দেয়ার জন্য তাহলে তা দিয়ে হালুয়া বানিয়ে দিতে পারতাম। আপনার এই শুকনো রুটি খেতে খুব কষ্ট হয়। খলিফা তাঁর স্ত্রীকে জবাব দিলেন, দেখো, এই আটা আমি খলিফা বলে বেশী ভোগ করতে পারিনা। এগুলো জনগণের হক। তার থেকে আমি এক চুল পরিমাণও বেশী পারিনা।
খলিফার স্ত্রী বুঝতে পেরে চিন্তা করলে কী করা যায়। যিনি সারাদিন ইসলামের কাজ করেন, জনগণের সেবা করেন তাকে একটু ভালো খাবার দিতে পারবোনা তা কেমন করে হয়। পরে তিনি প্রতিদিনকার আটা থেকে সামান্য পরিমাণ আটা তুলে রাখতেন। কিছুদিন পর বেশ কিছু আটা জমা হলে তা দিয়ে হালুয়া বানিয়ে রুটির সাথে খলিফাকে খেতে দিলেন। আর মনে মনে খুব খুশিও হলেন এই ভেবে, যাক অনেকদিন পর প্রাণের স্বামীকে একটু ভালো খাবার দিতে পেরেছেন। কিন্তু যেই খাবার খলিফা দৃষ্টিগোচার হলো সাথে সাথে তিনি স্ত্রীকে জিঙ্ঘেস করলেন, “এই হালুয়া কোত্থেকে বানানো হলো?” স্ত্রী খুশি হয়ে আসল ঘটনাটি খুলে বললেন। পরোক্ষণে খলিফা হযরত আবু বকর রাদ্বি আল্লাহু আনহু বায়তুল মালের রক্ষককে ডেকে বললেন, কাল থেকে যে ঐ পরিমাণ আটা কম দেয়া হয়, কেননা এতদিন এই পরিমাণ আটা কম খাওয়াতে সম্যসা হয়নি, বরঞ্চ তা পেঠের জন্য বেশী হয়ে গিয়েছিল। তার জন্য তিনি আফসোস করতে লাগলেন যে, কাল কিয়ামতের ময়দানে আল্লাহকে কী জবাব দেবেন।
এই হলো ইসলামী শাসক। যারা আল্লাহর ভয়ে সর্বদা তটস্থ থাকতেন। প্রজাদের অধিকারের ব্যপারে খুব সচেতন ছিলেন। অপচয় ও অপব্যয়ের ব্যাপারে খুবই সিরিয়াস ছিলেন।

আজ সময়ের দাবী, গভীর সংকটে নিপতিত আমাদের প্রিয় মাতৃভূমিকে বাঁচাতে, দেশের মানুষের উপর থেকে নির্যাতনের খড়গ নামাতে, দেশে শান্তি-শৃংখলা ফিরিয়ে আনতে, বিশেষত আল্লাহর যমীনে আল্লাহর দীন কায়েম করতে ইসলামী রাজনীতির মাধ্যমে একটি কল্যাণকর খোদায়ী জীবনব্যবস্থা এবং প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শের প্রতিষ্ঠিত শান্তিকামী, কল্যাণকর রাষ্ট্র গঠন কর। এ জন্য দেশের সংখ্যাগরিষ্ট সুন্নী মুসলমানকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে এবং আল্লাহর বিধান বাস্তবায়নে গুরুত্ব বুঝতে হবে। আল্লাহ তাবারকা তায়ালা আমাদের সবাইকে বুঝার তওফিক দিক। আমিন !

বিশেষ নিবন্ধঃ তৎপর জঙ্গীরাঃ সুন্নীদের ঘুম ভাঙবে কী ?

তৎপর জঙ্গীরাঃ সুন্নীদের ঘুম ভাঙবে কী ?
মুহাম্মদ জামাল উদ্দীন রব্বানী

২৭ আগষ্ট ২০১৪ সাল। ঢাকার রাজাবাজারের নিজ বাসায় এশার নামাযের প্রস্তুতিকালে কথিত ইসলামী হুকুমত প্রতিষ্ঠাকারী জঙ্গীগোষ্ঠির এক গুপ্তঘাতক অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় জঘন্যভাবে এজিদীয় কায়দায় জবেহ করে হত্যা করে আল্লামা শায়খ নুরুল ইসলাম ফারুকী সাহেবকে। তিনি কে পরিচয় দেয়ার দরকার পড়েনা। কারণ এ নির্মম হত্যাকান্ডের সাথে সাথে সারাদেশব্যাপী যে আন্দোলনের দাবানল ছড়িয়ে পড়ে তাতে বুঝা যায় তিনি কত জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব। কারবালায় ইমাম হুসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুর শাহাদাতে যেভাবে হায় হোসাইন হায় হোসাইন রব ওঠেছিল, সেদিন এ বাংলায়ও রব ওঠেছিল ফারকী, ফারুকী বলে। 
এ ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় সারাদেশে বড় বড় প্রতিবাদ সমাবেশ হয়েছে, বিক্ষোভ মিছিল হয়েছে, এমনকি বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রসেনার ডাকে এক ঐতিহাসিক নজিরবিহীন শান্তিপূর্ণ হরতালও হয়েছে। ঘটনার এক বছর অতিক্রান্ত হলেও প্রশাসন এখনো ফারুকীর হত্যাকারীদের সনাক্তও করতে পারেনি। বিচ্ছিন্ন দু’একজনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করেই তাদের দায় সেরেছে। আর সংবাদ মাধ্যমকে  বলেছে এটা জঙ্গীদের কাজ হতে পারে।
এরপূর্বে ঢাকার গোপিবাগে প্রায় একই কায়দায় জবেহ করে খুন করা হয় কথিত এক পীরসহ ৬জনকে। সে পীর নিজেকে ইমাম মাহদী হিসেবে পরিচয় দিত। সেই হত্যার ধরন আর ফারুকী হত্যার ধরন দেখে প্রশাসনসহ অপরাধ বিশ্লেষকরা বলেছেন এ ধরনের ঘটনা জঙ্গীদের পরিকল্পিত হত্যাকান্ড। প্রশাসন সেই কথিত পীরের খুনিদেরও গ্রেপ্তার করতে ব্যর্থ হন। সম্প্রতি একই কায়দায় খুন হন চট্টগ্রামের বায়জীদ এলাকার কথিত ল্যাংটা ফকির ও তার এক ভক্ত। তার পরপর পাবনায় এক খ্রীষ্টান ধর্মযাজককেও গলাকেটে হত্যার চেষ্টা করা হয়। সর্বশেষ ঢাকার বাড্ডা এলাকায় গলাকেটে হত্যা করা হয় পিডিবির সাবেক চেয়ারম্যান রাহমাতিয়া খানকার পীর দাবিদার খিজির খানকে।
সর্বশেষ তিনটা খুনের ঘটনায় যারা গ্রেপ্তার হয়েছে তারা প্রত্যেকেই জঙ্গীগোষ্টি জেএমবির সদস্য এবং তারা এ হত্যাকান্ডগুলোর সাথে জড়িত থাকার কথা স্বীকারও করেছে। চট্টগ্রামে খুন হওয়া কথিত ল্যাংটা ফকিরের খুনের ঘটনায় জড়িতরা বলেছে, ল্যাংটা ফকিরসহ যারা তাদের দৃষ্টিতে শরীয়ত বিরোধী কাজের সাথে জড়িত তাদেরকেই হত্যার সিদ্ধান্ত নিয়েছে জেএমরি নতুন নেতৃত্ব। তারা বলেছে মাজার কেন্দ্রিক শরীয়ত পরিপন্থি কাজকে সমুলে উৎপাটনের লক্ষে তারা নতুন করে সংগঠিত হয়েছে। এ লক্ষ্যে পাহাড়ী এলাকা হিসেবে চট্টগ্রামে তারা শক্ত আস্তানা গেড়েছে। এখানে জেএমবির ২৫০ এহছার সদস্য এবং ২৫০ গায়রে এহছার সদস্য সক্রিয় রয়েছে বলে দাবী করে তারা। ঢাকায় খিজির খানের হত্যায় জড়িত জেএমবি সদস্যরা বলেছে, তারা পীর-ফকির-দরবেশদের টার্গেট করে মাঠে নেমেছে।
আপনারা হয়তো ভুলে গেছেন, গত চার দলীয় জোট সরকারের আমলে সিলেটে শাহ জালাল রাহমাতুল্লাহি আলাইহির ওরশে বোমা হামলাসহ সারাদেশে অসংখ্য মাজার ও পীর ফকিরের আস্তানায় এ জেএমবি জঙ্গীরা হামলা করেছিল। তাদের নেতা বাংলা ভাই ও শায়খ আব্দুর রহমানের ফাঁসি হওয়ার পর তাদের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। এখন আবার নতুন করে সংগঠিত হয়েছে নিষিদ্ধ ঘোষিত ভয়ংকর এ জঙ্গী সংগঠনটি।   
আশংকার কথা হচ্ছে, যদি সত্যিই ধরা পড়া জঙ্গীদের এসব তথ্য সঠিক হয়ে থাকে তাহলে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকবে আমাদের সবচেয়ে শ্রদ্ধা ও সম্মানের স্থান মাজার শরীফ এবং পীর-আলেম সমাজ। যেখানে ফারুকী সাহেবের মতো একজন জনপ্রিয় আলেমকে হত্যা করতে এক বিন্দু পরিমান দ্বিধা করেনি সেখানে আমাদের অন্যান্য পীর-আলেমরা পার পাওয়ার সুযোগ কোথায়। তাদের কাছে ল্যাংটা ফকিরের আস্তানা ও বুজুর্গানে দ্বীনের মাজার শরীফের মধ্যে কোন তফাৎ নাই। সুতরাং ভাববার এখনি সময়। যদিও অনেক সময় আমরা নষ্ট করে এসেছি।
বাতিলদের এত তৎপরতার পরও মনে হয় আমরা ঘুমিয়ে আছি। সেনা- ফ্রন্ট ব্যতিত কারো কোন মাথা ব্যথা আছে বলে পরিলক্ষিত হচ্ছে না। ফারুকীর শাহাদাতের পর চতুর্দিকে ঐক্যের একটা আওয়াজ ওঠেছিল। দরবারীদের মধ্যেও হঠাৎ একটু সচেতনতা লক্ষ্য করা গিয়েছিল। যার প্রমাণ হিসেবে আমরা ২ সেপ্টেম্বর ২০১৪ সালে চট্টগ্রামের লালদীঘিতে ঐতিহাসিক জমায়েত দেখেছি। ঐক্যের কথা শুনেছি। শুনেছি অনেক পরিকল্পনার কথা। কিন্তু যে লাউ সে কদু। কোথায় কে কার ? ঘটনা ঘটলেই আমরা একটু নড়েচড়ে উঠি। তাও আবার সেনা- ফ্রন্ট নড়া চড়া করে বলে। তাদের নিজস্ব কোন কর্মসূচি পরিলক্ষিত হয়না।
সুন্নীয়তের মাঠে অল্পদিনের বিচরণের আমার অভিজ্ঞতায় দেখেছি, আমাদের দরবারীরা নিজস্ব শক্তি অর্জনের চেয়ে যে সরকার ক্ষমতায় থাকে সে সরকারকে কাছে রাখতে চেষ্টা করে। সে সরকারের তাবেদারী করে। এ যেমন পটিয়া আমির ভান্ডার দরবার শরীফের একটি সংগঠনকে দেখলাম চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আ’লীগ নেতা আ জ ম নাছির উদ্দীনকে সংবর্ধনা দিতে। কেন ঐ দরবারী সংগঠনটি মেয়র সাহেবকে সংবর্ধনা দিতে গেল তার কোন যৌক্তিক ব্যাখ্যা আমি খুঁজে পেলাম না। হ্যাঁ, মেয়র যদি পটিয়ার সন্তান বা জামাই হতেন বা তাদের মুরিদ হতেন অথবা ঐ সংগঠনটি আ’লীগের কোন অঙ্গ সংগঠন হতো তাহলে সংবর্ধনা দিলেও কোন আপত্তি থাকতো না। তার মানে, ওনি নগরের ক্ষমতায় এসেছেন, ওনাকে খুশি করে ওনার ক্ষমতাকে ব্যবহার করে ব্যক্তিগত স্বার্থ হাছিল করা, এ ছাড়া আর কি! পীরদের যদি ক্ষমতাসীনদের তোয়াজ করে পীরগীরি করতে হয় তাহলে এ পীরদের কাছ থেকে মাযহাব মিল্লাত কী পাবে? আমার বিশ্বাস, এরা হয়তো সাময়িক কিছু স্বার্থ হাছিল করতে পারবে, কিন্তু জেএমবির মতো জঙ্গীদের কাছ থেকে বাচঁতে পারবে না। আর তাদের মতো ভন্ডদের জন্য ফারুকিদের কাতারের আলেম-পীরদেরও হয়তো হামলার শিকার হতে হবে। তাতে ক্ষতি হবে মাযহাব মিল্লাতের। ক্ষতি হবে সুন্নীয়তের। এক সময় হয়তো এদেশে সুন্নী দাবী করাও কঠিন হয়ে পড়বে। এজন্য সঠিক পীর-মাশায়েখদের এগিয়ে আসতে হবে। হতে হবে ঐক্যবদ্ধ। গড়তে হবে রাজনৈতিক শক্তি। কারণ রাজনৈতিক শক্তি অর্জন ব্যতিরেখে দেশে সুন্নিয়ত প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। প্রিয় নবিজীর  হায়াতে জিন্দেগী এবং খোলাফায়ে রাশেদীনের খেলাফতকাল দেখলে কোন পীর-আলেমই ইসলামী শক্তির বাইরে কোন মানবগড়া মতবাদের সাথে লেয়াজু বা তাদের সমর্থন করতে পারেন না। যারা ইসলামের আদর্শ প্রচারের কথা বলে তারা আবার দুর্বল মানবগড়া মতবাদের ধ্বজাধারী হয় কিভাবে? আমরা যারা মানবগড়া শক্তির সাথে আপোস করিনি, আমরা কি দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছি? নাকি না খেয়ে মরে গেছি। তারাই লেয়াজু করে চলে যাদের আল্লাহর উপর ভরসা নাই। আর যাদের আল্লাহর উপর ভরসা নাই তারা আল্লাহর দ্বীনের দাওয়াত দেওয়ার খানকা খুলে কিভাবে ? আর যদি না বুঝে ঘুমের মধ্যে থাকেন তাহলে তাদের কানে জোরে চিৎকার দিয়ে বলি- জঙ্গী আসছে! জেগে ওঠুন। নইলে আপনাদেরকে ঘুমের মধ্যে জবেহ করে দিবে। 
অতএব, আসুন আমরা আর ঘুমিয়ে না থেকে জেগে ওঠি। নবীর সৈনিকেরা জেগে আছে। পাহাড়া দিচ্ছে দ্বীনের বাগান। কাজ করে যাচ্ছে সুন্নীয়ত প্রতিষ্ঠার। আপনারা কেন ঘুমিয়ে থাকবেন ? জেগে ওঠুন! গা ঝাড়া দিয়ে শামিল হোন সেনার মিছিলে। শুধু খানকায় বসে থেকে এখন আর মদিনায় যাওয়া যায়না, মদিনায় যেতে সেনার কাফেলায় ওঠতে হবে। আশেকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লামা নঈমুদ্দীন আলকাদেরী রাহমাতুল্লাহে আলাইহি তো বলেই গেছেন-
“ অসি হাতে ছুটরে সেনা বুকে পাক কোরান
ভয় করিসনা তোদের প্রতি আল্লাহ মেহেরবান
আয় ছুটে আয় দলে দলে সেনার পতাকায়
এ কাফেলা একমাত্র যাবে মদিনায়।”

বিশেষ নিবন্ধঃ সংখ্যালঘুদের ওপর হামলাঃ ইসলামে অমুসলিমদের অধিকার


সংখ্যালঘুদের ওপর হামলাঃ ইসলামে অমুসলিমদের অধিকার
মুহাম্মদ জামাল উদ্দিন রব্বানি 

1971 সালের মুক্তিযুদ্ধ আমি দেখিনি। তবে ৭১ এ পাক হানাদারদের সাথে দেশের বিরোধীতাকারী জামাতি রাজাকার- আল বদর- আল শামসদের নারকীয় তান্ডবলীলার কথা বই পুস্তক, পত্র-পত্রিকা, মিডিয়া এবং নির্যাতিতদের মুখ থেকে শুনেছি, জেনেছি । আর এ তান্ডবলীলা কী ভয়ংকর হতে পারে তা ক্ষুদ্র বোধিতে কিছুমাত্র অনুমান করেছিলাম সত্য, তা যে কত ভয়াবহ  হতে পারে সেটি পুরোপুরি বোধগম্য হয়েছে ২০১৩ সালে এসে। যারা ইসলামের কথা বলে, ইসলামী আইন প্রতিষ্ঠার আন্দোলন করে, সৎ লোকের শাষন চাই (?) তাদের নির্মমতার প্রকৃষ্ট বাস্তবতা দেখে আমি স্তম্ভিত হই। অবশ্যই তাদের নির্মমতার প্রদর্শনি দেশ স্বাধীনের পর থেকে ৪২ বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে দেখে আসলেও, এমনকি নিজে এবং নিজের দল তাদের নির্মমতার শিকার হলেও ৭১ এর নারকীয় তান্ডবের বাস্তব চিত্র প্রত্যক্ষ করলাম গত ২৮ ফেব্রুয়ারী ’১৩ ইং যখন সেই ৭১ এর কুখ্যাত রাজাকার, নবী- অলীদ্রোহী, ভন্ড মুফাসসির দেল্লু রাজাকার খ্যাত মৌং দেলোয়ার হুসাইন সাঈদীকে  আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল ফাঁসির আদেশ দেয় । সারা দেশে একযোগে তারা নৃশংস হামলা চালায় পুলিশ, পুলিশ স্টেশন, সরকারী স্থাপনা, দোকান-পাট, রেল, রেল স্টেশন, বাস-গাড়ী, সাধারণ জনগণ, এমনকি এ দেশে সংখ্যালঘু হিসাবে বসবাসকারী  হিন্দু- বৌদ্ধ নিরীহ মানুষের উপর । হত্যা করা হয় নিরীহ সংখ্যালঘুদের, জ্বালিয়ে দেয়া হয় তাদের ঘর- বাড়ী। ভেঙ্গে গুড়িয়ে দেয়া হয় তাদের মন্দির, গীর্জা, পেকোডা । যেমনটি করেছিল মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে । তারা দাবী করছে ৭১ এ সাঈদী বা জামায়াত কোন অপরাধ করেনি। কোন মা-বোনদের তারা নির্যাতন করেনি। কোন সংখ্যালঘূদের ওপর হামলা করেনি। কিন্তু ২০১৩ সালে এসে এগুলো আমরা কী দেখলাম? তারা যে অপরাধ করেছে তার বাস্তব প্রমাণ কি এটি নয় ? শুধু তাই নয়, গত ০৪ মার্চ ’১৩ মিডিয়ার কল্যাণে দেশের মানুষ দেখল, দেখল পুরো পৃথিবীবাসী তাদের নৃশংতার আরেক ঘৃণ্য পরিকল্পনা। সেই দিন দেশের শীর্ষস্থানীয় ১০ আলেমকে হত্যার নীল নকশা প্রণয়ন করে তা বাস্তবায়নের নিমিত্তে ঐ আলেমদের বাসা রেকি করতে গিয়ে ধরা পড়ে শিবিরের ৮ ক্যাডার। এ কি তাদের ইসলাম কায়েম? সত্যিই কি তারা ইসলামের রাজনীতি করে বা ইসলামী দল?
অথচ ইসলামী রাষ্ট্রে মুসলিমরা তো বটেই অমুসলিমদেরকেও যে অধিকার প্রদান করা হয়ছে তাতে তাদের এক বিন্দু পরিমান জান-মালের ক্ষতি সাধন ইসলামে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। দেয়া হয়েছে তাদের ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও নাগরিক অধিকার।
ইসলামী রাষ্ট্রে একজন অমুসলিমের প্রাণের মর্যদা একজন মুসলিমের সমান। হিদায়ার ৪র্থ খন্ডে, ৫৪৬ পৃষ্টায় স্পষ্ট বলা হয়েছে- “যিম্মি (এখানে সংখ্যালঘূ ) হত্যা করা নিষিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও কোন মুসলিম ব্যক্তি যদি কোন যিম্মিকে হত্যা করে তবে বিনিময়ে তাকেও হত্যা করা হবে”। এ কারণে একজন অমুসলিম নাগরিকের রক্তপণ একজন মুসলিমের সমান ধার্য্য করা হয়েছে ।
প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অমুসলিমদের জীবন রক্ষার অধিকার সম্পর্কে বলেছেন- “ মান কাতালা মুয়াহিদান লাম ইয়ারিহ  রা-য়িহাতাল জান্নাতে ওয়া ইন্না রিহুহা তু-জাদু মিন মছিরাতি আরবাঈনা খারিফান” অর্থ্যাৎ যদি কোন ব্যক্তি কোন যিম্মি তথা সংখ্যালঘুকে হত্যা করে তবে জান্নাতের ঘ্রাণও তার নসীব হবেনা। অথচ চল্লিশ বছরের দূরত্বে থেকেও জান্নাতের ঘ্রাণও পাওয়া যাবে ।
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর জীবদ্দশায় আমর ইবনে ঊমাইয়া নামক এক ব্যক্তি ‘আমির’ গোত্রীয় দুইজন সংখ্যালঘূকে হত্যা করলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহই ওয়াসাল্লাম তাদের রক্তপণ মুসলমানদের সমান প্রদান করতে আদেশ দেন।
এমনকি যিম্মিদের প্রতি যুলুম করা থেকে বিরত থাকা প্রসঙ্গে রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেনঃ “ আলা মান যালামা মুয়াহিদান আউ ইন্তাকাচাহু আউ কাল্লাপাহু পাওকা ত্বকিতাহু আউ আখাজা মিনহু শাইয়ান বিগাইরি ত্বি-বি নাফসিহি পাআনা হুজ্জিহি ইয়াওমাল কিয়ামাহ”
অর্থাৎ সাবধান! কেউ যদি কোন যিম্মিদের প্রতি যুলুম করে অথবা তাকে তার অধিকার থেকে কম দেয়া হয় কিংবা ক্ষমতা বহির্ভূত কোন কাজ তার ওপর চাপিয়ে দেয়া হয় বা জোর পূর্বক তার থেকে কোন মালামাল নিয়ে নেয়া হয় তাহলে কিয়ামতের দিন আমি তার পক্ষ অবলম্বন করবো। ( আবু দাউদ শরীফ )
কিন্তু আমরা জামায়ত- শিবিরের ইসলামে কী দেখলাম? তারা ইসলামের নামে সারা দেশজুড়ে সাধারণ নাগরিকের পাশাপাশি দেশের সংখ্যালঘূ হিন্দু-বৌদ্ধদের ওপর আল্লাহু আকবর স্লোগানে নির্বিচারে নগ্ন হামলা চালালো, মানুষ মারলো, মন্দিরে ভাংচুর করলো। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীসের আলোকে আমরা স্পষ্ট বলতে পারি, জামায়াতে ইসলাম ও তাদের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র শিবির আসলে কোন ইসলামী দল নয়, এমনকি ইসলামের সাথে তাদের দূরতম সম্পর্কও নাই। বরং তাদের এ হীন কাজের জন্য কিয়ামতের ময়দানে রাসূলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নির্যাতিতদের পক্ষ হয়ে তাদের বিরুদ্ধে অবস্থান করবেন ।
ইসলামের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ইসলাম মুসলিম রাষ্ট্রে অমুসলিমদেরকে তাদের ধর্ম ও কৃষ্টি- কালচার রক্ষার ব্যাপারেও পূর্ণ স্বাধীনতা দান করেছে। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কতৃক প্রণীত পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম লিখিত সনদ ‘মদীনা সনদে’ও আমরা দেখতে পায়, তিনি ইসলামী রাষ্ট্রে সকল ধর্মের মানুষের ধর্মীয় স্বাধীনতার পাশাপাশি নাগরিক সুবিধার অধিকার দিয়েছিলেন। হযরত আবু ঊবায়দা (রাঃ) ‘কিতাবুল আমওয়াল’ গ্রন্থে পরাজিত কয়েকটি দেশের নাম উল্লেখ করে বলেন, এ সকল দেশের অধিবাসীগণ মুসলমানদের নিকট পরাজিত হয়ে তাদের বশ্যতা স্বীকার করেছিল। অথচ এ সকল দেশের অমুসমলিম অধিবাসীদেরকে তাদের ধর্মীয় ব্যাপারে পূর্ববৎ বহাল রাখা হয়েছে।
এভাবে অমুসলিমদেরকে ইসলামী রাষ্ট্রে সামাজিক ও নাগরিক অধিকার দেয়ার কথাও স্বীকৃত। হযরত আবু বকর (রাঃ) এর খেলাফতকালে দেখা যায়- যে সব অমুসলিম অধিবাসী জীবিকা উপার্জনে অক্ষম ছিলেন তাদেরকে তিনি ভাতা প্রদানের ব্যবস্থা করেছিলেন । তিনি তাঁর খেলাফত কালে সেনাপতি খালিদ (রাঃ) এর মাধ্যমে হিরার অধিবাসীদের সাথে যে চুক্তি করেছিলেন, তাতে ছিলঃ “ তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি বৃদ্ধ হয়ে কর্মে অক্ষম হয়ে যাবে অথবা অন্য কোন কারণে বিপদগ্রস্থ হবে অথবা দরিদ্র হয়ে যাবে তাদের কর মওকূফ করে দেওয়া হবে। অধিকন্তু বায়তুল মাল হতে তাদেরকে এবং পরিবারবর্গকে ভাতা প্রদান করা হবে”।
আমিরুল মু’মিনিন হযরত ঊমর (রাঃ) একদা এক বৃদ্ধ ইয়াহুদীকে ভিক্ষা করতে দেখে তাকে বায়তুল মালের খাযাঞ্ছির নিকট পাঠিয়ে আদেশ দিলেন, “ তাকে এবং তার মত অন্যান্য ব্যক্তিদের জন্য বায়তুল মাল থেকে ভাতার ব্যবস্থা করে দাও। যৌবনে তাদের থেকে জিযয়া উসূল করে বার্ধক্যে দ্বারে দ্বারে ভিক্ষা করতে দেওয়া ন্যায় বিচার হবেনা”।
সুতরাং এসব আলোচনার প্রেক্ষিতে নির্ধিদ্বায় বলতে পারি, ইসলাম বা ইসলামী রাষ্ট্রে শুধু মুসলমানদের নিরাপত্তা ও অধিকার দিয়েছে তা নয়, সাথে সাথে অমুসলিমদেরও সমান নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করেছে। আজকে যারা ইসলামের ছদ্মাবরণে দেশের সংখ্যালঘূ হিন্দু- বৌদ্ধদের উপর হামলা করছে তারা ইসলামকে কলংকিত করছে। সাধারণ মুসলমানদের মধ্যে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে ইসলামকে বিশ্ববাসীর কাছে হেয় প্রতিপন্ন করছে । আজ সময় এসেছে তাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার। ইসলাম ও দেশকে জামাতি হায়েনার হিংস্র থাবা থেকে রক্ষা করা ঈমানী ভাইদের উপর ফরয হয়ে পড়েছে । দায়িত্ব হয়ে পড়েছে সংখ্যাগরিষ্ট মুসলিম দেশে অমুসলিমদের জান-মাল- অধিকার রক্ষার। যদি আমরা সেই দায়িত্ব পালনে সামান্যতম গাফলতি করি কাল কিয়ামতের ময়দানে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের বিপক্ষেও অবস্থান করবেন।

গল্পঃ একটি আমের জন্য

একটি আমের জন্য
জামাল রব্বানি

টুপটুপ বৃষ্টি পড়ছে। মৃদু ঠান্ডা হাওয়াও বইছে। বোশেক মাস। আমের দিন। প্রচন্ড গরমের মধ্যে এ যেন খানিকটা প্রশান্তি ও প্রস্বস্থি। রাব্বির কঁচি চঞ্চলা মন বারবার চাইছে একটু বাইরে বেরুতে। কিন্তু মায়ের বকুনি শুনতে হবে ভয়ে বের হচ্ছেনা। ক্লাস সিক্সে পড়–য়া একটা ছেলের মন কেমন হয় সেটা হয়তো সকলে আমরা বুঝি। কারণ সে শৈশবকালটি আমরা সকলে পেরিয়ে এসেছি। একটু খেলাধুলা, বাইরে বন্ধুদের সাথে দৌড়াদৌড়ি, দাপাদাপি, আমের দিনে আম কুড়ানো, আম গাছে ঢিল ছোড়া, ভরদুপুরে বাড়ীর সামনের পুকুরে সাঁতার কেটে পানি ঘোলা করা এই যা।  
রব্বির স্কুল গ্রীষ্মের বন্ধ। স্কুল যেদিন বন্ধ দিয়েছে সেদিন তার কী যে খুশি। এই তো সূযোগ। এবার বেশী করে বন্ধুদের সাথে খেলতে পারবো, আড্ডা দিতে পারবো,  আম কুড়াতে পারবো। কত মজা হবে।
রাব্বিদের কোন আম গাছ নেই। থাকবে কোত্থকে ? থাকার মতো যার দ’ুদন্ড জায়গা নেই , সেখানে আম গাছ থাকবে কোত্থকে ? 
রাব্বীর বাবা দরিদ্র শ্রমিক। দিনে এনে দিনে খায়। কোন দিন কাজে যেতে না পারলে সেদিন স্ত্রী, পুত্র নিয়ে উপোস থাকতে হয়। তার বাবার উত্তরাধিকার সুত্রে পাওয়া মাত্র দুই রুমের একটি কুড়ে ঘরে কোন রকম দিন কাটাতে হয়। কষ্ট করে সংসার চালায় আর স্বপ্ন দেখে একমাত্র পুত্র রাব্বীকে লেখা-পড়া শিখিয়ে বড় মানুষ করবে।
রাব্বীর পাশের ঘরে চাচাদের একটি আম গাছ আছে। ঐ গাছে আম পাকলে সেগুলো একটু বাতাসেই ঝরে পড়ে। টিনের চাল, তাই আম পড়লে ঝন্ করে শব্দ হয়। রাব্বী চায়, ঐ ঝরে পড়া আম নিতে। কিন্তু মা নিতে দেয় না। তারা দরিদ্র হলে কী হবে, আতœসম্মানবোধ আছে। ঐ আম নিতে গেলে যদি বড় কথা বলে। তাই মা নিষেধ করে দিয়েছে উঠোনে আম পড়ে থাকলেও যেন না ধরে। মায়ের সুবোধ বালক রাব্বীও তাই ঔ আম ধরে না। 
মায়ের কাছে সে বায়না ধরেছে, যেন বাজার থেকে তার জন্য বাবা আম এনে দেয়। কিন্তু দরিদ্র পিতার যেখানে নুন্ আনতে পান্তা ফুরায় সেখানে বাজার থেকে আম কিনে আনা কষ্ট সাধ্য ব্যাপার। তবুও বাবা চেষ্টা করছে আম কিনে এনে ছেলেকে খাওয়াতে। একদিন দু’দিন করে সপ্তাহ চলে যায়। আম আনতে পারেনা। ছেলেকে বারবার আনবে বলে  আশ্বস্থ করে।
একদিন রাতের ঘটনা। রাব্বী রাতের খাবার খেয়ে পড়ার টেবিলে পড়ছে। পরিশ্রমী পিতা সারাদিন মেহনত করে এসে রাতে খাবার পর আর বসে থাকতে পারে না। শুয়ে পড়ে। মা ছেলের পড়ার জন্য রাত জেগে থাকে, বসে থাকে পাশে। কিন্তু সেদিন মাও সারাদিন খাটুনি খাটায় শরীর যেন ঝিমিয়ে পড়েছে। তাই মাও তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়েছে। রাব্বী মনোযোগ দিয়ে টেবিলে পড়ছে। এমন সময় ঝন্ করে টিনের চালে শব্দ হলো। তার মানে গাছ থেকে আম পড়েছে। হঠাৎ তার মন উৎলা হয়ে ওঠলো। আম খাওয়ার ইচ্ছা হলো। ছোট ছেলে তো। মায়ের নিষেধ থাকলেও আজ কেন জানি তার মন চাইলো ঐ আম খেতে। আধাঁর রাত। সবাই ঘুমিয়ে। এখন একটি আম নিলে হয়তো কেউ দেখবে না। আর একটি আম নিলে কী বা হবে। মায়েরাও ঘুমিয়ে, চাচারাও ঘুমিয়ে। এখনি মুক্ষম সময়।
রাব্বী কান পেতে শুনল কেউ চাচাদের ঘর থেকে বের হলো কিনা। না,  কোন সাড়া শব্দ নাই। নিশ্চিত হয়ে সে চুপিসারে ঘরের দরজা খুললো। অন্ধকার রাত। সামনে দু’কদমও দেখা যাচ্ছে না। সে কুপিটা একটু বের করে উঠোনের কোন্ জায়গায় আমটি আছে নিশ্চিত হলো। তারপর কুপিটা ঘরে রেখে তটস্থ মনে কম্পিত কদমে আমের লক্ষ্যে এগিয়ে গেল। আমের খুব কাছাকছি পৌঁছে সে যেইমাত্র আমে হাত দিবে এমন সময় চাচাদের ঘর থেকে দরজা খুলে গর্জন দিয়ে ওঠলো, কে ?
রাব্বী ভয় পেয়ে গেল। সে কম্পিত কন্ঠে বলল, চাচা আমি রাব্বী।
এখানে কি করছ ? -চাচার ঝাঁঝালো কন্ঠ।
তিনি বলতে লাগলেন, আম চুরি করতে আসছ ? তোমার বাবা তো তোমারে লেখা-পড়া শেখায়। কী, চুরি করার জন্য ? বেটা, লেখাপড়া শিখছে না চুরি শিখছে। ঐতো আমি বলিনা ! যে যত বড় শিক্ষিত, সে তত বড় চোর। তোমার মা তোমারে পেটে নিয়ে কোন দিন আম খাইনি তো। তুমি চুরি করবেনা কি করবে ?- আরো সব বিশ্রি শব্দ চাচার কন্ঠে।
রাব্বীর বাবা-মা ইতোমধ্যে ঘুম থেকে ওঠে এসেছে। বাইরে বেরিয়ে দেখে তাদের একমাত্র আদরের ছেলেটি একটি আমের জন্য সাজাপ্রাপ্ত চোরের মতো নিতর দাঁড়িয়ে আছে আর চোখ দিয়ে টপটপ পানি পড়ছে। ঐ দিকে চাচা অশ্রাব্য ভাষায় কি সব বলে যাচ্ছে। ছেলের ঐ অবস্থা দেখে বাবা-মা চোখে পানি ধরে রাখতে পারলো না।
বাবা গিয়ে ছেলেকে হাত ধরে ঘরে নিয়ে আসলো। কিন্তু রাব্বীকে কিছুই বললো না।
পরের দিন গুড়িগুড়ি বৃষ্টি আর হালকা বাতাসে যখন আম গাছ থেকে আম পড়ছে, অবুঝ রাব্বী সেই আমের দিকে চেয়ে চেয়ে কী যেন ভাবছে।  

হালচালঃ বিরক্তিকর

 বিরক্তিকর
""""""'''''''''''""""""""""

পায়ু পথে বায়ু নির্গমন। আঞ্চলিক ভাষায় কি বলে আমরা সবাই জানি। এখানে আমি 'হাওয়া' বলে মিন করি।
কোন মজলিশে কেউ একজন ক্ষীণ বা উচ্চ স্বরে হাওয়া ছাড়লে তা নিয়ে স্তরভেদে এক একেক রকম প্রতিক্রয়া লক্ষ্য করা যায়।
পেঠের অতিরিক্ত এই হাওয়া মানুষকে ছেড়ে দিতেই হয়। সবারই এই হাওয়া ছাড়ার অভ্যাসটি আছে। তবে সেটা যদি ছোট বাচ্চাদের মাঝে হয়, তাহলে সেটা নিয়ে হইচই তো হবেই। কে ছাড়ল, কে ছাড়ল বলে হণ্যে হয়ে খুঁজতে থাকে হাওয়া ত্যাগকারীকে। তারপর তারপ্রতি তির্যক মন্তব্য ছুড়তে থাকে অন্যরা।
অথবা সেটা যদি গণ্যমান্য মহলে হয়, তাহলে ভদ্রতার খাতিরে সবাই বিষয়টি এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করে।
বন্ধুমহলে কিছুটা রসিকতা হয় বটে, তবে তা কোনবস্থাতেই মানসম্মান হেরেজ করে নয়।
এই হাওয়ার বিষয়টি উপস্থিত ব্যক্তিবর্গের মধ্যে সীমাবদ্ধ হলেও ইদানিং ফেসবুকের কল্যাণে তা নিয়ে রীতিমত ট্রল চলছে। সামান্য ফুটুস করে ছাড়া হাওয়াটি ফেসবুকে আসতে আসতেই যেন এটম বোমায় রূপ নে। যার যে রকম ইচ্ছা সেরকম করে বোমা ফাটায় আর সারা বিশ্বজুড়ে তোলপাড় চলে বেচারা হাওয়া ত্যাগকারীকে নিয়ে। যেন হাওয়া ত্যাগ করাটা কোন এক মহাপাপ বা নিষিদ্ধ কাজ।
## মার্ক জুকারবার্গ কি যে বানাই দিলেন আমাদেরকে। ভালই ব্যবহার চলছে।

প্রবন্ধঃ শান্তির খোঁজে

শান্তির খোঁজে
মুহাম্মদ জামাল উদ্দীন রব্বানী


ঋতুরাজ বসন্ত শুরু হয়েছে। ডাকতে শুরু করেছে কোকিল। সমুধর কণ্ঠ তার। শীতে ঝরে পড়া পত্র পল্লব পুণঃ অঙ্কুরিত হচ্ছে গাছে গাছে। কনকনে শীতের বদলে এখন মিষ্টি রোদ। প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য্য যেন ঢেলে ঢেলে সাজিয়েছে এ দেশকে। কিন্তু সে সৌন্দর্য্য দেখবে কে ? মানুষের নজর তো মঙ্গল গ্রহের দিকে। পাহাড় থেকে হাতির পাল নেমে আশে পাশের সাজানো গোছানো বাড়ী ঘরকে যেমন পায়ের তলায় পিষ্ট করে দিয়ে চলে যায়, তেমনি কিছু মানুষ নামক পশু রাজনীতির খেলায় এ দেশকে তছনছ করে লুটেপুটে খায় আবার ডিজিটাল করার স্ব্প্ন দেখায়।
সাম্প্রতিক সময়ে সরকারী দল ও বিরোধী দল এমন উন্মত্ত হয়ে ওঠেছে অবস্থা দৃষ্টে মনে হচ্ছে গদি ছাড়া তারা কিছু বুঝেনা। দেশ বা দেশের মানুষ জাহান্নামে যাক তাদের কিছু আসে যায় না। সীমান্তে পাখি মারার মতো মানুষ মারছে বি এস এফ কিন্তু স্থানীয় সরকার মন্ত্রী ও সরকারী  দলের সেক্রেটারি বললেন- ’ অতীতেও সীমান্তে মানুষ মরেছে, এখনো মরছে, ভবিষ্যতেও মরবে, এটা নিয়ে সরকার চিন্তিত নয়”। কত বড় দেশপ্রেমিকের মতো কথা! যে দেশের মানুষের জন্য সরকার চিন্তা করেনা সে দেশের মানুষ তাদের ভোট দেয় কেন? এটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। আসলে আমরা জনগণেরও কিছু দোষ আছে। ”কিছু” বললে ভুল হবে, বলতে হবে প্রধান দোষ। যেহেতু আমরাই বলে থাকি ” জনগণই সকল ক্ষমতার উৎস” (ইসলাম বলে আল্লাহই সকল ক্ষমতার উৎস) সেহেতু আমরাই চাইলে এদের কান ধরে নামাতে পারি। কিন্তু প্রশ্ন হলো শূন্যস্থান পুরণ করবে কে ? বিরোধী দল। এরাও তো একই নায়ের মাঝি। ঐ যে বলা হয় ” যে যায় লঙ্কায় সে হয় রাবণ”। ১৯৯১ সাল থেকে এরা দেশকে পালাক্রমে লুটেপুটে খেয়ে আসছে শুধু নয়, একেবারে তছনছ করে দিচ্ছে। আসল কথা হচ্ছে, রাসূলে আরবী (দঃ) বলেছেন- ” যে দেশে নারী নেতৃত্ব দেয় সে দেশ সফলকাম নয়” (বুখারী)।
সুতরাং জনম জনম ধরে মাথা কুটলেও এ শনির রাহু থেকে দেশকে মুক্ত করা সম্ভব নয় যদি নারী পেতনীদের (নেত্রী) কবল থেকে দেশকে উদ্ধার করা না যায়। অনেকেই বলতে পারেন এরশাদ কাকুর কথা। আপনারাই বলুনতো, যে মানুষের হাতে একজন বিবাহিত নারী সুখে থাকতে পারেনা, যে বারবার পরনারীর দিকে ঝুঁকে পড়ে, যাকে নারী পেতনীরাই স্বৈরাচার আখ্যা দিয়েছে, যে ক্ষণে ক্ষণে রূপ বদলায়, তার হাতে দেশ ও দেশের মানুষ নিরাপদ কিনা ? হয়তো কেউ ফিসফিস করে জামাতে ইসলামীর কথা বলতে পারেন। তারা মোটামুটি খারাপ না। শয়তানের বড় ভাই। ইসলামের দোহাই দিয়ে দেশটাকে আবারো পাকিস্থান বানাতে খুব বেশী দেরী করবেনা। এজিদ বাহিনীর কথা মনে পড়ে ? এরা নব্য এজিদ বাহিনী। তাহলে বলতে পারেন, আমরা কোথায় যাব ? কোথাও যাব কেন, যেটা আছে সেটা নিয়ে থাকলে তো অশান্তিতে থাকার কথা নয়। আল্লাহ আমাদের মানুষ বানিয়েছেন, শ্রেষ্ঠ নবীর উম্মত বানিয়েছেন, জীবন চলার জন্য নির্ভেজাল সংবিধান আল কুরআন দিয়েছেন। আমাদের কাছে সব কিছু থাকতে আমরা কেন মুজিববাদ, জিয়াবাদ, মার্কসবাদ, লেলিনবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ ইত্যাদি চরম ব্যর্থ মতবাদগুলোর দিকে যাব ? আসলে আমরা চরম বোকা। অস্ট্রিয়ার ইহুদি একজন সাংবাদিক লিওপোল্ড উইস তার ইসলাম গ্রহণ সম্পর্কে তার বিখ্যাত বই ”ওংষধস ধঃ ঃযব পৎড়ংং-জড়ধফং” এ লিখেছেন- ” ইসলাম এক কুশলী স্থপতির পূর্ণাঙ্গ সৃষ্টির মতো। এর সবগুলো অংশই পরস্পরকে পূর্ণ ও মজবুত করে তোলার জন্য হিসাব করে তৈরি; এতে নেই কোন বাড়তি, নেই কোন ঘাটতি; ফলে এর মাঝে রয়েছে পূর্ণ ভারসাম্য আর মজবুত স্থিরতা”
কিন্তু আমরা চোখ থাকতেও অন্ধ। বিবেক দিয়েছি বিসর্জন। সবচেয়ে দামী হিরা, মানিক, মুক্তা আমাদের কাছে থাকতেও আমরা তা ব্যবহার করছিনা। নজর দিচ্ছি পরের ড্যামেজ মালের দিকে।
লিওপোল্ড উইস পরে যার নাম হয় মুহাম্মদ আসাদ তিনিও মুসলমানদের অধ:পতন ও দূর্দশাগ্রস্থতা দেখেছিলেন। তবুও কেন ইসলাম গ্রহন করেছিলেন ? তাঁর স্বীকরোক্তি - ” মুসলমানদের অতীত ও বর্তমানের মধ্যে সুস্পষ্ট অসামঞ্জস্যে হতভম্ব হয়ে আমি আমার সামনে উপস্থিত সমস্যাকে আরো ঘনিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখবার চেষ্টা করলাম ; মানে আমি নিজকে ইসলামের গন্ডির মধ্যে কল্পনা করবার চেষ্টা করলাম। এটা ছিল নিছক বুদ্ধিবৃত্তি সংক্রান্ত পরীক্ষার ব্যাপার : এবং এর ফলে অল্পকালের মধ্যে আমার কাছে সঠিক সমাধান ধরা পড়ল। আমি উপলব্ধি করলাম যে, মুসলিমদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পতনের একমাত্র কারণ হচ্ছে এই যে, তারা ধীরে ধীরে সত্যিকারের ইসলামী শিক্ষার প্রাণবস্তু অনুসরণে বিরত হয়েছে”।
সত্যিই আজ আমরা ইসলামী শিক্ষা ও আইনের অনুসরণ থেকে যোজন যোজন দূরে আছি। ইসলামের অতীত ইতিহাস অত্যন্ত গৌরবের। সকল বাতুলতা ও জাহিলিয়াতকে পদদলিত করে যে ইসলাম পৃথিবীবাসীকে দিয়েছিলো শান্তির পরশ, সে ইসলাম আজ আমাদের কাছে অপাঙতেয়। তাই তো মুহাম্মদ আসাদ লিখেছেন- ” ইসলাম এখনো রয়েছে ; তা একটি প্রাণহীন দেহ”। এর জন্য দায়ী আমরা মুসলমানরাই। নচেৎ কেন আমরা ইসলামী দুশমনদের ফাঁদে পা দিয়ে ঘরের শান্তিময় পরিবেশ বাদ দিয়ে পরের কৃত্রিম শান্তির খোঁজে ছুটে মরছি ?
১৬শ শতাব্দী থেকে শুরু করে একুশ শতকের এ পর্যন্ত মানব জীবনে শান্তি স্থাপনের জন্য ব্যাঙের ছাতার মতো মানব সৃষ্ট বহু মতবাদ গড়ে ওঠেছে। কিন্তু এসব মানব রচিত মতবাদ শান্তি স্থাপন ও সমস্যা সমাধানের পরিবর্তে জীবনকে করে তুলেছে আরো সংকটময়, সমস্যাসংকুল। ১৬ শতাব্দীতে গীর্জা ও সিংহাসনের সংঘাত জন্ম দিয়েছে ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্র আর এ ধর্মহীন গণতন্ত্রের স্বাভাবিক পরিণতিতে উদ্ভব হয়েছে চরম নির্যাতনমূলক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা পুঁজিবাদ।
লাগামহীন পুঁিজবাদী অর্থব্যবস্থার ঘোড়ার দাপটে পিষ্ট হয়েছে মানবতা, নির্যাতিত হয়েছে  বঞ্চিতের দল। অষ্টাদশ শতাব্দী থেকে বিংশ শতাব্দীর প্রথমাংশ পর্যন্ত  বিশ্বের কল্যাণকামী চিন্তানায়কগণ এ অবস্থা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য চিন্তা গবেষনা শুরু করলেন। অবশেষে হেগেল ও ডারউইনের চিন্তার উচ্ছিষ্ঠ দ্বান্দিক বস্তুবাদের নির্যাস থেকে মহাতœা কাল মার্কস আবিষ্কার করলেন মুক্তির এক নতুন মতবাদ ” সমাজবাদ”। তাঁর এ মতবাদের দীক্ষা গ্রহণ করলেন লেলিন ও স্তালিন। তারা অত্যন্ত আকর্ষণীয়ভাবে পেশ করলেন ব্যক্তি মালিকানার বিরুদ্ধে যুক্তি। নাস্তিক্যবাদী সমাজবাদ মুক্তি, শান্তি ও প্রগতির শ্লোগান তুলে বিপুল জনগোষ্ঠির মন আকৃষ্ট করলেও শেষ পর্যন্ত তা মানব সমাজে শান্তি স্থাপনে চরম ব্যর্থ হয়। অশান্তির দাবানল জ্বলতে থাকে চতুর্দিকে।
তাই আজ সারা বিশ্বে মানব রচিত মতবাদের যাঁতাকল থেকে মুক্তি লাভ করে খোদায়ী জীবন দর্শন ইসলামী তথা সুন্নীয়তের আদর্শের বুনিয়াদে জীবন পরিচালনার উদ্যোগ গ্রহণ জরুরী শুধু নয় ফরযে আইন। কিন্তু আমরা বিশেষত সুন্নীরা কোন পর্যায়ে আছি ? সত্যি কথা বলতে কী, আমাদের ইসলামী ব্যক্তিত্বদের অধিকাংশই ইসলামের পূর্ণাঙ্গরূপ বাস্তবায়নের তেমন কোন চিন্তাধারায় নেই। যাদেরকে আমরা বাহরুল উলূম বলি, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের কান্ডারী বলি তারা ইসলামের সুফিবাদ, যিকির - আযকার, তসবিহ - তাহলিল, ওরস- ফাতেহা, নজর -নেওয়াজ, ফযিলতি ওয়াজ মাহফিল দাওয়াত ইত্যাদির বেশি কিছু চিন্তা করেন না। তাদের মতে নামায -রোযা, মাযার- ওরস - ফাতেহা, মাহফিলে যাওয়া এটুকুই নিজের জীবনের জন্য যথেষ্ট। কিন্তু ইসলামী আইন কানুন অর্থনীতি, সমাজনীতি, রাজনীতি, সমরনীতি এ গুলোতে  তাদের কোন মাথা ব্যাথা নেই। এমনকি খোদায়ী দর্শনের বিপরীত কুফরী ও নবীদ্রোহী শাষন ব্যবস্থায় তারা চলতে বাধ্য হলেও তারপরেও তাদের হৃদমন্দিরে কম্পন হয়না। ধর্মীয় মূল্যবোধের উপর চরম আঘাতে আসলেও তাদের বিবেকে লাগেনা। অথচ তারাঁয় ওয়াজ মাহফিলে মোটা অংকের হাদিয়া গ্রহনের বিনিময়ে মানুষকে জান্নাতে যাওয়ার রূপকথা শুনিয়ে আসেন। মানব জীবনের সংবিধান গ্রন্থ আল কুরআনের তেলাওয়াত ও প্রিয় নবীর আদর্শিক বাণীর সংকলন বুখারীর খতম আদায় করে বালা- মুুসিবত ও দুনিয়াবী ফায়দা অর্জনের পথ দেখান । ইসলামের নামে কোঠি কোঠি টাকা নিজেরা ইনকাম করেন বটে ইসলামের জন্য তারা দুই টাকা খরচ করেননা। ভাগ্যিস, কিছু নির্লোভ, ত্যাগি, প্রজ্ঞাবান আলেম ছিলেন, প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রসেনা, বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট। যাদের কারণে আজ বাংলার বুকে লক্ষ লক্ষ কিশোর ছাত্র যুবক অথৈ সাগরে পালছেড়া নৌকার মতো ভাসতে থাকা ইসলামী নায়ের দাঁড় ধরে আছে। উত্তাল ঢেউ ও চরম ঝড়ের মধ্যেও এ না’ কোন রকম লড়াই করে টিকে আছে। নৌকার মেছাল দিতেও ভয় লাগে। কারণ ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী তথা ধর্মহীনদের একটি বড় অংশ নৌকায় চড়ে বসে আছে। কিছু সুন্নী(?) আওয়ামী আলেমদের নৌকা প্রীতির কারণে আমাদেরকে মুজিববাদী আওয়ামী লীগের বি টিমের অপবাদ দেয়া হয়। ঐ সকল আলেম মনে করে নবীর দুশমন জামাতীদের ঠেকাতে মুজিববাদীদের সাপোর্ট দিতে হবে। নচেৎ তাদের ব্যবসার ক্ষেত্র সুন্নীয়ত টিকবেনা। ওয়াজী ব্যবসা হবেনা। ওয়াজে হামলা হবে। মাযারে ব্যবসা হবেনা। মাযারে বোমা হামলা হবে। এ জন্য তাদের সমর্থন দিতে হবে। কিন্তু আমরা ঘূর্ণাক্ষরেও চিন্তা করিনা আমরা তো এক ্আল্লাহর উপর অটল বিশ্বাস করি। আমরা তাকদিরের ভালো মন্দের উপর বিশ্বাস করি। হায়াত- মউত- রিযিকের মালিক আল্লাহ বলে জানি।আল্লাহর প্রতি যাদের এ বিশ্বাস নেই তারাই শুধু অন্যের উপর ভর করে চলার চেষ্ঠা করেন। তাহলে আামাদের ঈমান কোন পর্যায়ে আছে, তা কি আর কাউকে বলার দরকার আছে ?  নামায দোয়াও পড়ি আল্লাহর সংবিধান মাচার উপর তুলে রেখে আবার মানবগড়া মতবাদের দালালীও করি। রাসূলে পাক (দঃ) তাদের ব্যাপারে কী বলেছেন জানেন ?  “যে ব্যক্তি ইসলামী সংগঠন ত্যাগ করে এক বিঘত দূরে সরে গেছে সে নিজের গর্দান থেকে ইসলামের রশি খুলে ফেলেছে। তবে যদি সে সংগঠনে প্রত্যাবর্তন করে তা স্বতন্ত্র কথা। সাহাবাগণ আরজ করলেন- হে আল্লাহর রাসূল (দঃ), সালাত কায়েম এবং সাওম পালন স্বত্তেও ? রাসূল (দঃ) বললেন, সালাত কায়েম, সাওম পালন এমনকি মুসলিম দাবী স্বত্তেও। (মুসনদে আহমদ)
সুতরাং এখন দেয়ালে ঠেকে যাওয়া পিঠকে রক্ষা করতে আমাদেরকেই সামনে এগিয়ে আসতে হবে। আমাদের ভান্ডার তো খালি নয়, আমাদের হাতে জীবনের শ্রেষ্ঠ হাতিয়ার ও সংবিধান আল কুরআন এবং হাদীসে নববী রয়েছে। যেটার বলে বলিয়ান হয়ে অসংখ্য সাহাবায়ে কেরম, আউলিয়ায়ে কেরাম, মর্দে মুজাহীদরা ইসলামকে বিশ্বের বুকে প্রতিষ্ঠা করেছে, আমাদেরকেও এগিয়ে যেতে হবে সেই পন্থায়। কারো পিঠে চড়ে শান্তি খোঁজ করতে চাইনা, শান্তি  পেতে হলে কোরান ও হাদীসের ভেলায় চড়তে হবে। তবেই পৌঁছবো মুক্তির কাঙ্খিত ঠিকানায়। শান্তির পরশ বইবে তখন সারা বিশ্বময়।

কবিতাঃ সড়কে লাশের সারি

সড়কে লাশের সারি
"""""""""""""""""'

সড়ক জুড়ে লাশের সারি
কান্নার রোল বাড়ি বাড়ি
কেউ কি জবাব দেয়ার নাই?
দায়ীর যদি না হয় ফাঁসি
মন্ত্রী দেয় মুচকি হাসি
মোদের কি কিছু করার নাই?

কিছু যে কিছু করার আছে
শিক্ষার্থীরা তা দেখিয়ে দিছে
আমরা যে শুধু অথর্ব,
-গদীর কথায় চিন্তা করি
এছাড়া আর কি করব।

আইন করিলাম
ফাইন করিলাম
'আর হবেনা' ওয়াদা দিলাম
নাকি স্বাদের গদিও ছাড়ব?

ইসলামে রাজনীতি ও তাকওয়া

 ভূমিকা ইসলামে রাজনীতি ও রাজনীতিতে তাকওয়া বর্তমান প্রেক্ষাপটে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। বর্তমান দুনিয়ায় ‘ইকামতে দীন’ তথা আল্লাহর আইনপ্রতি...