Thursday, 1 August 2019

বিশেষ নিবন্ধঃ সংখ্যালঘুদের ওপর হামলাঃ ইসলামে অমুসলিমদের অধিকার


সংখ্যালঘুদের ওপর হামলাঃ ইসলামে অমুসলিমদের অধিকার
মুহাম্মদ জামাল উদ্দিন রব্বানি 

1971 সালের মুক্তিযুদ্ধ আমি দেখিনি। তবে ৭১ এ পাক হানাদারদের সাথে দেশের বিরোধীতাকারী জামাতি রাজাকার- আল বদর- আল শামসদের নারকীয় তান্ডবলীলার কথা বই পুস্তক, পত্র-পত্রিকা, মিডিয়া এবং নির্যাতিতদের মুখ থেকে শুনেছি, জেনেছি । আর এ তান্ডবলীলা কী ভয়ংকর হতে পারে তা ক্ষুদ্র বোধিতে কিছুমাত্র অনুমান করেছিলাম সত্য, তা যে কত ভয়াবহ  হতে পারে সেটি পুরোপুরি বোধগম্য হয়েছে ২০১৩ সালে এসে। যারা ইসলামের কথা বলে, ইসলামী আইন প্রতিষ্ঠার আন্দোলন করে, সৎ লোকের শাষন চাই (?) তাদের নির্মমতার প্রকৃষ্ট বাস্তবতা দেখে আমি স্তম্ভিত হই। অবশ্যই তাদের নির্মমতার প্রদর্শনি দেশ স্বাধীনের পর থেকে ৪২ বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে দেখে আসলেও, এমনকি নিজে এবং নিজের দল তাদের নির্মমতার শিকার হলেও ৭১ এর নারকীয় তান্ডবের বাস্তব চিত্র প্রত্যক্ষ করলাম গত ২৮ ফেব্রুয়ারী ’১৩ ইং যখন সেই ৭১ এর কুখ্যাত রাজাকার, নবী- অলীদ্রোহী, ভন্ড মুফাসসির দেল্লু রাজাকার খ্যাত মৌং দেলোয়ার হুসাইন সাঈদীকে  আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল ফাঁসির আদেশ দেয় । সারা দেশে একযোগে তারা নৃশংস হামলা চালায় পুলিশ, পুলিশ স্টেশন, সরকারী স্থাপনা, দোকান-পাট, রেল, রেল স্টেশন, বাস-গাড়ী, সাধারণ জনগণ, এমনকি এ দেশে সংখ্যালঘু হিসাবে বসবাসকারী  হিন্দু- বৌদ্ধ নিরীহ মানুষের উপর । হত্যা করা হয় নিরীহ সংখ্যালঘুদের, জ্বালিয়ে দেয়া হয় তাদের ঘর- বাড়ী। ভেঙ্গে গুড়িয়ে দেয়া হয় তাদের মন্দির, গীর্জা, পেকোডা । যেমনটি করেছিল মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে । তারা দাবী করছে ৭১ এ সাঈদী বা জামায়াত কোন অপরাধ করেনি। কোন মা-বোনদের তারা নির্যাতন করেনি। কোন সংখ্যালঘূদের ওপর হামলা করেনি। কিন্তু ২০১৩ সালে এসে এগুলো আমরা কী দেখলাম? তারা যে অপরাধ করেছে তার বাস্তব প্রমাণ কি এটি নয় ? শুধু তাই নয়, গত ০৪ মার্চ ’১৩ মিডিয়ার কল্যাণে দেশের মানুষ দেখল, দেখল পুরো পৃথিবীবাসী তাদের নৃশংতার আরেক ঘৃণ্য পরিকল্পনা। সেই দিন দেশের শীর্ষস্থানীয় ১০ আলেমকে হত্যার নীল নকশা প্রণয়ন করে তা বাস্তবায়নের নিমিত্তে ঐ আলেমদের বাসা রেকি করতে গিয়ে ধরা পড়ে শিবিরের ৮ ক্যাডার। এ কি তাদের ইসলাম কায়েম? সত্যিই কি তারা ইসলামের রাজনীতি করে বা ইসলামী দল?
অথচ ইসলামী রাষ্ট্রে মুসলিমরা তো বটেই অমুসলিমদেরকেও যে অধিকার প্রদান করা হয়ছে তাতে তাদের এক বিন্দু পরিমান জান-মালের ক্ষতি সাধন ইসলামে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। দেয়া হয়েছে তাদের ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও নাগরিক অধিকার।
ইসলামী রাষ্ট্রে একজন অমুসলিমের প্রাণের মর্যদা একজন মুসলিমের সমান। হিদায়ার ৪র্থ খন্ডে, ৫৪৬ পৃষ্টায় স্পষ্ট বলা হয়েছে- “যিম্মি (এখানে সংখ্যালঘূ ) হত্যা করা নিষিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও কোন মুসলিম ব্যক্তি যদি কোন যিম্মিকে হত্যা করে তবে বিনিময়ে তাকেও হত্যা করা হবে”। এ কারণে একজন অমুসলিম নাগরিকের রক্তপণ একজন মুসলিমের সমান ধার্য্য করা হয়েছে ।
প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অমুসলিমদের জীবন রক্ষার অধিকার সম্পর্কে বলেছেন- “ মান কাতালা মুয়াহিদান লাম ইয়ারিহ  রা-য়িহাতাল জান্নাতে ওয়া ইন্না রিহুহা তু-জাদু মিন মছিরাতি আরবাঈনা খারিফান” অর্থ্যাৎ যদি কোন ব্যক্তি কোন যিম্মি তথা সংখ্যালঘুকে হত্যা করে তবে জান্নাতের ঘ্রাণও তার নসীব হবেনা। অথচ চল্লিশ বছরের দূরত্বে থেকেও জান্নাতের ঘ্রাণও পাওয়া যাবে ।
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর জীবদ্দশায় আমর ইবনে ঊমাইয়া নামক এক ব্যক্তি ‘আমির’ গোত্রীয় দুইজন সংখ্যালঘূকে হত্যা করলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহই ওয়াসাল্লাম তাদের রক্তপণ মুসলমানদের সমান প্রদান করতে আদেশ দেন।
এমনকি যিম্মিদের প্রতি যুলুম করা থেকে বিরত থাকা প্রসঙ্গে রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেনঃ “ আলা মান যালামা মুয়াহিদান আউ ইন্তাকাচাহু আউ কাল্লাপাহু পাওকা ত্বকিতাহু আউ আখাজা মিনহু শাইয়ান বিগাইরি ত্বি-বি নাফসিহি পাআনা হুজ্জিহি ইয়াওমাল কিয়ামাহ”
অর্থাৎ সাবধান! কেউ যদি কোন যিম্মিদের প্রতি যুলুম করে অথবা তাকে তার অধিকার থেকে কম দেয়া হয় কিংবা ক্ষমতা বহির্ভূত কোন কাজ তার ওপর চাপিয়ে দেয়া হয় বা জোর পূর্বক তার থেকে কোন মালামাল নিয়ে নেয়া হয় তাহলে কিয়ামতের দিন আমি তার পক্ষ অবলম্বন করবো। ( আবু দাউদ শরীফ )
কিন্তু আমরা জামায়ত- শিবিরের ইসলামে কী দেখলাম? তারা ইসলামের নামে সারা দেশজুড়ে সাধারণ নাগরিকের পাশাপাশি দেশের সংখ্যালঘূ হিন্দু-বৌদ্ধদের ওপর আল্লাহু আকবর স্লোগানে নির্বিচারে নগ্ন হামলা চালালো, মানুষ মারলো, মন্দিরে ভাংচুর করলো। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীসের আলোকে আমরা স্পষ্ট বলতে পারি, জামায়াতে ইসলাম ও তাদের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র শিবির আসলে কোন ইসলামী দল নয়, এমনকি ইসলামের সাথে তাদের দূরতম সম্পর্কও নাই। বরং তাদের এ হীন কাজের জন্য কিয়ামতের ময়দানে রাসূলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নির্যাতিতদের পক্ষ হয়ে তাদের বিরুদ্ধে অবস্থান করবেন ।
ইসলামের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ইসলাম মুসলিম রাষ্ট্রে অমুসলিমদেরকে তাদের ধর্ম ও কৃষ্টি- কালচার রক্ষার ব্যাপারেও পূর্ণ স্বাধীনতা দান করেছে। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কতৃক প্রণীত পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম লিখিত সনদ ‘মদীনা সনদে’ও আমরা দেখতে পায়, তিনি ইসলামী রাষ্ট্রে সকল ধর্মের মানুষের ধর্মীয় স্বাধীনতার পাশাপাশি নাগরিক সুবিধার অধিকার দিয়েছিলেন। হযরত আবু ঊবায়দা (রাঃ) ‘কিতাবুল আমওয়াল’ গ্রন্থে পরাজিত কয়েকটি দেশের নাম উল্লেখ করে বলেন, এ সকল দেশের অধিবাসীগণ মুসলমানদের নিকট পরাজিত হয়ে তাদের বশ্যতা স্বীকার করেছিল। অথচ এ সকল দেশের অমুসমলিম অধিবাসীদেরকে তাদের ধর্মীয় ব্যাপারে পূর্ববৎ বহাল রাখা হয়েছে।
এভাবে অমুসলিমদেরকে ইসলামী রাষ্ট্রে সামাজিক ও নাগরিক অধিকার দেয়ার কথাও স্বীকৃত। হযরত আবু বকর (রাঃ) এর খেলাফতকালে দেখা যায়- যে সব অমুসলিম অধিবাসী জীবিকা উপার্জনে অক্ষম ছিলেন তাদেরকে তিনি ভাতা প্রদানের ব্যবস্থা করেছিলেন । তিনি তাঁর খেলাফত কালে সেনাপতি খালিদ (রাঃ) এর মাধ্যমে হিরার অধিবাসীদের সাথে যে চুক্তি করেছিলেন, তাতে ছিলঃ “ তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি বৃদ্ধ হয়ে কর্মে অক্ষম হয়ে যাবে অথবা অন্য কোন কারণে বিপদগ্রস্থ হবে অথবা দরিদ্র হয়ে যাবে তাদের কর মওকূফ করে দেওয়া হবে। অধিকন্তু বায়তুল মাল হতে তাদেরকে এবং পরিবারবর্গকে ভাতা প্রদান করা হবে”।
আমিরুল মু’মিনিন হযরত ঊমর (রাঃ) একদা এক বৃদ্ধ ইয়াহুদীকে ভিক্ষা করতে দেখে তাকে বায়তুল মালের খাযাঞ্ছির নিকট পাঠিয়ে আদেশ দিলেন, “ তাকে এবং তার মত অন্যান্য ব্যক্তিদের জন্য বায়তুল মাল থেকে ভাতার ব্যবস্থা করে দাও। যৌবনে তাদের থেকে জিযয়া উসূল করে বার্ধক্যে দ্বারে দ্বারে ভিক্ষা করতে দেওয়া ন্যায় বিচার হবেনা”।
সুতরাং এসব আলোচনার প্রেক্ষিতে নির্ধিদ্বায় বলতে পারি, ইসলাম বা ইসলামী রাষ্ট্রে শুধু মুসলমানদের নিরাপত্তা ও অধিকার দিয়েছে তা নয়, সাথে সাথে অমুসলিমদেরও সমান নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করেছে। আজকে যারা ইসলামের ছদ্মাবরণে দেশের সংখ্যালঘূ হিন্দু- বৌদ্ধদের উপর হামলা করছে তারা ইসলামকে কলংকিত করছে। সাধারণ মুসলমানদের মধ্যে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে ইসলামকে বিশ্ববাসীর কাছে হেয় প্রতিপন্ন করছে । আজ সময় এসেছে তাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার। ইসলাম ও দেশকে জামাতি হায়েনার হিংস্র থাবা থেকে রক্ষা করা ঈমানী ভাইদের উপর ফরয হয়ে পড়েছে । দায়িত্ব হয়ে পড়েছে সংখ্যাগরিষ্ট মুসলিম দেশে অমুসলিমদের জান-মাল- অধিকার রক্ষার। যদি আমরা সেই দায়িত্ব পালনে সামান্যতম গাফলতি করি কাল কিয়ামতের ময়দানে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের বিপক্ষেও অবস্থান করবেন।

No comments:

Post a Comment

ইসলামে রাজনীতি ও তাকওয়া

 ভূমিকা ইসলামে রাজনীতি ও রাজনীতিতে তাকওয়া বর্তমান প্রেক্ষাপটে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। বর্তমান দুনিয়ায় ‘ইকামতে দীন’ তথা আল্লাহর আইনপ্রতি...