Sunday, 27 October 2019

ইফতেখার উদ্দীন বাবুঃ সুন্নীয়তের এক নির্ভীক মুজাহিদ


আমার বাড়ীর পাশের বাড়ীটায় তার নানার বাড়ী। তার নিজের বাড়ী অবশ্যই পাশ^বর্তী বাড়ৈকাড়া গ্রামে। গ্রামের পথ ধরে ২৫ মিনিট হাটলেই আরাকান সড়কের পাশ ঘেঁষে শাহ্গদী মার্কেটের ঠিক পশ্চিম পাশের্^ই তার নানার বাড়ীতে আসা যায়। বেশ আসতো সে। এক সময় নানার বাড়ীতে থেকেই লেখা-পড়া করতো।
কালো, মাঝামাঝি গড়নের, নাদুস-নুদুস মায়াবী চেহারার বাবুকে ঠিক ছোট্ট বাবুর মতোই আমার লাগতো। তাকে দেখতাম। কিš‘ কোনো কথা হতো না। এক সময় শাহ্গদী মার্কেট শাখা সেনানী নুরুল আলম রুবেলের সাথে পরিচয় ঘটে বাবুর। দু’জনের বন্ধুত্বও হলো, সাথে ছাত্র সেনার কর্মকান্ডে জড়িয়েও পড়লো। সম্ভবত এভাবেই সে সংগঠনে অন্তর্ভূক্ত হয়। এবার কথা বলার সুযোগ হয় তার সাথে। কথা হয় তবে খুব বেশী নয়, মাঝে-মধ্যে। এমনিতে সে একটু লাজুক স্বভাবের। তথাপি আমারও তখন নিম্ম শাখাগুলোতে সময় দেয়ারও সময় ছিল না। যেহেতু আমি কেন্দ্রীয় দায়িত্বশীল। এলাকার বাইরে আমাকে সময় বেশি দিতে হতো।
সংগঠনে যুক্ত হওয়ার পর থেকে যতটুকু কথাবার্তা হতো তাতেই বুঝতে পারি সুন্নীয়তকে সে অত্যন্ত ভালোবাসে এবং এ সংগঠনের জন্য সে নিবেদিত প্রাণ।
২০১২ সাল। শাহ্গদী মার্কেটে আমরা একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করতে চায়। ছোট ছোট কিছু বৈঠক শেষে আগ্রহী ২৫ জনের ১টি তালিকা তৈরী হলো। প্রত্যেকে মাসে দুই হাজার টাকা করে দশ মাসে বিশ হাজার টাকা অর্থায়ন করবে। অনেক সামর্থবানের যেখানে ঐ টাকা দিতে গলদঘর্ম হয়েছিল সেখানে মাত্র কুড়ি বছরের ইফতেখার বাবু সে টাকা নিয়মিত আদায় করেছে। অথচ সেসময় সে তার বাবাকে হারিয়েছে, পরিবারের হাল ধরতে হয়েছে, অল্প বেতনের চাকরি। এসবের কোনো কিছুই একটি মহৎ উদ্যোগে সহযোগিতা করতে তার বাঁধা হতে পারেনি। কষ্টের টাকা তুলে দিল সে স্কুল প্রতিষ্ঠার জন্য। অথচ সেই টাকা থেকে এক টাকাও লাভের আশা নেই। তার নিজের এলাকাতেও নয়। তবুও সে টাকা দিল। দিল এ কারণেই, বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করা হ”েছ সুন্নীয়তের স্বার্থে, সেনানীদের উদ্যোগে। এ জন্যই তার অর্থায়ন। পরিবারের এমন দুর্দিনে নিজের এত অল্প বয়সে সুন্নীয়তের স্বার্থে অর্থায়ন করা নিশ্চই এক নির্ভীক মুজাহিদের পক্ষেই সম্ভব।
এছাড়া সম্প্রতি তার এলাকার শিক্ষা-দীক্ষার জন্য আলহাজ¦ সৈয়দ সাইফুল ইসলাম মিয়া প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিলে সে প্রায় আড়াই গন্ডা জমি বিদ্যালয়ের জন্য দান করেছে। অনেক ধনী ব্যক্তির পক্ষেও অনেক সময় এত জমি দান করার সাহস হয়না। অথচ সে তার পরিবারের পক্ষ থেকে বিনা দ্বিধায় জায়গা দিয়ে দিল। শিক্ষা-দীক্ষার জন্য, এলাকার গরীব-অসহায় মানুষের জন্য, বিপদগ্র¯’ মানুষের জন্য সে ছিল উদারহস্ত। এলাকায় তার ডাক নাম ছিল মতিন। ছোট-বড়, ধনী-গরিব, নারী-পুরুষ সবাই থাকে ভালোবাসত। তার গুণের কথা, দানের কথা, সমাজের সবার সাথে তার হৃদ্যতার কথা বলেনা এমন কোনো মানুষ নেই এলাকায়। এসব কিছুই তার সুন্নীয়তের জন্য। সুন্নীয়ত ভিত্তিক ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য।
ছাত্রসেনাকে সে কত ভালোবাসত তার একটা ঘটনা বলি। বিদ্যালয়ের প্রথম পরিচালনা কমিটি গঠনের সময় বৈঠকে মুরব্বীরা আমাকে সেক্রেটারি প্রস্তাব করলে বাবুসহ সেনার দায়িত্বশীলরা তাতে ভেটো দিয়ে বলে, “ভাইয়া সেনার কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক। ওনাকে বিভিন্ন জেলায় যেতে হয়। ওনাকে এখানে সেক্রেটারির দায়িত্ব দিয়ে আটকে রাখা ঠিক হবেনা।” এখানে আমি ব্যক্তির চেয়ে সংগঠনকে তারা বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। এর দ্বারা বুঝা যায় ছাত্রসেনা ছিল তার হৃদয়ের গভীরে।
ইফতেখার এক সময় বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রসেনা শাহ্গদী মার্কেট শাখার দায়িত্ব ছেড়ে তার নিজ ইউনিয়ন বড়লিয়া ইউনিয়ন শাখায় দায়িত্ব নেয়। ছোট কালটা তার কেটেছে নানার বাড়ীতে। বড়লিয়ায় তেমন কারো সাথে খুব বেশি পরিচয় না থাকলেও খুব অল্প দিনের মধ্যে বাবু সেনা ফ্রন্ট সবার আপন হয়ে যায়। তার মুল কারণ, সে ত্যাগী। ত্যাগ শুধু মেধা বা শ্রমের মাধ্যমে নয়। সে সংগঠনের জন্য প্রচুর অর্থও খরচ করত। যদিও বা তার আয় বেশি ছিল না। শুধু কি সংগঠনের জন্য, তার এলাকার গরীব-দু:খী, সাহায্যপ্রার্থী কাউকেই সে খালি হাতে ফেরাতো না। গরীবের মেয়ের বিয়ের জন্য বা এতিম খানার ছেলেদের জন্য তার আলাদা একটা খরচ ছিল। যা অনেক সময় আমরাও জানতাম না। শহর থেকে এক দুদিনের জন্য এসে যাওয়ার সময় অনেকসময় সে ধার করে গাড়ী ভাড়া নিয়ে যেত। আমি মাঝে মধ্যে বকা দিতাম, বুঝাতাম পরিবারের ভবিষ্যৎ চিন্তা করতে। কিš‘ সে বলতো ,“ ভাইয়া আমি না দিয়ে পারি না।” এই ছিল ইফতেখার উদ্দীন বাবু। সংগঠন ও মানবতার জন্য এই রকম মেলা হাতে খরচ করতে যে কেউ পারেনা। এক্ষেত্রে সে ছিল হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) এর মতো উদারহস্ত।
সে বলতো, সংগঠন করতে হলে টাকা খরচ করতে হবে। মানুষের পাশে না দাঁড়ালে, মানুষকে সাহায্য না করলে মানুষ আমাদের নির্বাচনে কেন ভোট দেবে? তার স্বপ্ন ছিল মোমবাতি মার্কায় ইউনিয়ন নির্বাচন করার। সে লক্ষ্যেই সে এগিয়ে যা”িছল।
সংগঠনের কোন কর্মসূচি বাস্তবায়নে তাকে দেখতাম রাত-দিন পরিশ্রম করতো। সে টাকার চিন্তার চেয়ে বেশি চিন্তা করতো কর্মসূচি সফল করতে। টাকা যা উঠে, ঘাটতি হলে বাবু আছে। তাইতো সংগঠনের অনেক দুরাব¯’ার মধ্যেও বড়লিয়া ইউনিয়নের কর্মকান্ড ছিল চোখে পড়ার মতো।
২০১৭ সালে যখন সে ইউনিয়নের সি. সহ-সভাপতি। আমাকে ফোন দিয়ে বলল, অমুক তারিখ আমরা কাপ্তাই শিক্ষা সফর যা”িছ, আপনাকে আমাদের সাথে যেতে হবে। গেলামও। দেখলাম, প্রায় ৪৫ জনের ঐ কাফেলায় সবার পরনে গেঞ্জি এক কালারের এবং পেছনে ইফতেখারের সৌজন্যে বøক মারা। এতজনের গেঞ্জিসহ আরো অনুদান ঐ সফরের জন্য তার ছিল যা অনেক সময় আমাদের বড় শিল্পপতি নেতারাও দেন না। আসলে সংগঠনের জন্য তার পকেট ছিল উন্মোক্ত। এই রকম সিদ্দীকি মুজাহিদ সংগঠনে বড্ড প্রয়োজন।
সংগঠনের ইউনিয়ন নির্বাচন, উপজেলা নির্বাচন ও জাতীয় নির্বাচনে তার সর্বস্ব উজাড় করা যে ভূমিকা আমি দেখেছি তা আমাকে অভিভূত করেছে। এমন নিবেদিত প্রাণ কর্মীটি ২০১৮ সালে ইউনিয়ন সভাপতির দায়িত্ব পালন শেষে যখন কমিটি নবায়ন করতে যা”িছল আমি তাকে উপদেশ দিয়েছিলাম দায়িত্ব ছেড়ে দেয়ার জন্য। কিন্ত এমন নিবেদিত প্রাণকে কে হারাতে চায়? ইউনিয়নের নেতা-কর্মীরা তাকে পূনরায় সভাপতির গুরু দায়িত্বভার তুলে দিয়ে আমার মনে হয় অনেকটা নির্ভার হয়েছিলেন।
এছাড়া তরিকতের খেদমতের জন্যও সে ছিল অন্তপ্রাণ। কাদেরীয়া তরিকার অন্যতম সংগঠন ‘গাউসিয়া কমিটি বাংলাদেশ’ বড়লিয়া ইউনিয়ন শাখার সে ছিল সহ-দপ্তর সম্পাদক এবং ৫ নং ওয়ার্ড বাড়ৈকাড়া শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক। জামেয়া, আঞ্জুমানের প্রতি তার ছিল আলাদা টান। সুযোগ পেলেই সে চলে যেতো জামেয়ার বিভিন্ন অনুষ্ঠানে।
বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের সাথেও সে সমানভাবে জড়িত ছিল। তন্মধ্যে পটিয়া স্বপ্নীল পরিবার লি. অন্যতম। এই সংগঠনটির মাধ্যমে বিভিন্ন সেবামূলক কর্মকান্ড বিশেষ করে দু¯’-অভাবীদের জন্য চাল বিতরণ, ইফতার সামগ্রী বিতরণ, শীতার্তদের মাঝে কম্বল বিতরণ, প্রয়োজনীয় এলাকায় বিশুদ্ধ পানির ব্যব¯’াসহ গরিব মেয়েদের বিয়েতে এককালীন সাহায্য প্রদানসহ নানা কর্মসূচি পরিচালনা করতো। 
এই রকম ভালো মন ও উদার দিলের মানুষকে যে মহান আল্লাহ ও তাঁর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহিয় ওয়াসাল্লাম এত তাড়াতাড়ি কাছে টেনে নিতে ডাক দিলেন, সে ডাকে সাড়া না দেয়ার দু:সাধ্য তো বাবুর ছিল না। আল্লাহ ও তাঁর হাবিব (দ.) যাকে ভালোবাসেন তাঁকে মনে হয় খুব তাড়াতাড়িই নিয়ে যান। সে জন্য মনে হয় তার দ্বারা অল্প বয়সে সব ভালো কাজও আদায় করে নিয়েছেন।
তাকে হারানোটা আমি বিশ^াস করতে পারছিনা বলে এতক্ষণ পরেও লিখতে পারছিনা যে ইফতেখার গত ২৭ জুলাই সন্ধ্যা ৬টায় আমাদের ছেড়ে আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে চলে গেছেন। তার অফিসের কলিগের মোটর সাইকেলে অফিসের কাজে যাওয়ার সময় ঘাতক ট্রাক তার বাইককে পেছন থেকে ধাক্কা দিলে ঘটনা¯’লে সে শাহাদাতের অমীয় সুধা পান করে।
যদিও ঘটনাটি মর্মান্তিক, কিš‘ ইসলামের দৃষ্টিতে সে একজন শহিদের মর্যাদা পাবে। কেননা “মহামারী, ডায়রিয়া, পানিতে নিমজ্জন, অগ্নিদগ্ধ, পক্ষাঘাত, গর্ভাব¯’া ও চাপা পড়ে [ঘর, বৃক্ষ, গাড়ি ধ্বংস¯‘প প্রভৃতি] যারা মৃত্যুবরণ করবেন, ইসলামের দৃষ্টিতে তারা শহিদ হিসেবে পরিগণিত হবেন। [বুখারি ও আবু দাউদ] এই হাদিসে নববী মতে প্রিয় নবীর আদর্শের এই মর্দে মুজাহীদ একজন শহিদ। যেহেতু সে গাড়ি চাপায় ইন্তেকাল করেছে।
অন্য দিক দিয়ে ইফতেখার একজন প্রিয় নবীর আদর্শের মর্দে মুজাহীদ, বীর সেনানী। জীবনের পুরোটা সময় প্রিয় নবীর আদর্শের রাজ কায়েমে ছাত্রসেনার সংগঠনে থেকে জিহাদ করেছে। আল্লাহ তায়ালা কুরআনের মজিদের সূরা ইমরানের ১৬৯ নম্বর আয়াতে ঘোষণা করেছেন- ‘আর যারা আল্লাহর রাহে নিহত হয় তাদেরকে তুমি কখনো মৃত মনে কোরো না বরং তারা নিজেদের পালনকর্তার নিকট জীবিত ও জীবিকাপ্রাপ্ত।’ যেহেতু ইফতেখার আল্লাহর পথে জিহাদে রত ছিলো সেহেতু সেও শহিদ।
আর শহিদদের ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘এভাবে আল্লাহ জানতে চান কারা ঈমানদার আর তিনি তোমাদের কিছু লোককে শহিদ হিসেবে গ্রহণ করতে চান। আল্লাহ অত্যাচারীকে ভালোবাসেন না।’ (সূরা আলে ইমরানের ১৪০) প্রিয় নবীর আদর্শের  এই নির্ভীক মুজাহিদকে হয়তো আল্লাহ তায়ালা শহিদ হিসেবে গ্রহণ করে নিয়ে গেছেন।
আর যারা শহীদের মর্যাদা প্রাপ্ত হন, ইসলামের দৃষ্টিতে তাদের কবর আজাব মাফ এবং জান্নাতে তারা অফুরন্ত নিয়ামত লাভ করবেন।  সে যে একজন জান্নাতী বা আল্লাহর নেয়ামত প্রাপ্ত তার ইন্তেকালের পর জানাযা মাঠেও তা প্রতিভাত হয়। ঐ এলাকায় একজন মৃত মানুষের জন্য এত মানুষ জানাযায় উপ¯ি’ত হওয়াটাও ছিল বিস্ময়ের। এলাকার এমন কোন মানুষ ছিল না, যারা তার জন্য চোখের পানি ফেলে নি, জানাযায় অংশগ্রহণ করেনি। সেনানীরা তো ছিলই। ইফতেখারের জন্য বড় নেয়ামতটি ছিল এটি যে, বাংলার খাজা খ্যাত এতদঞ্চলের প্রখ্যাত অলী, মুশকিল কোশা হযরত শাহ্গদী (রহ.) এর পবিত্র মাজারে পাকের একদম লাগোয়া শায়িত হতে পারা। সুন্নীয়তের নির্ভীক এই মুজাহিদ যে একজন সত্যিই সৌভাগ্যবান ছিলো হয়তো এটাই তার প্রমাণ। আল্লাহ তায়ালা তাকে জান্নাতে আ’লা মকাম দান করুক। প্রিয় নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একজন নির্ভীক সৈনিক হিসেবে তাঁর সুপারিশ লাভ করুক এবং নবিজির দিদার নসীব করুন । আমিন।
সবাইকে তো চলে যেতে হবে। এভাবে কাউকে হারাবো সেটা যেমন কাম্য নয়, আল্লাহর কাছ থেকে কাউকে ছিনিয়ে নেয়ার দু:সাধ্যও আমাদের নেই। আজ ইফতেখারের বিদায় কাল হয়তো আমাদের কারও। আমরাও যেন ইফতেখারের মতো নি:স্বার্থভাবে সুন্নীয়তের সমাজ প্রতিষ্ঠায় কাজ করে অমর হতে পারি, ইফতেখারের অপূরনীয় স্বপ্ন আমরা যেন বাস্তবায়ন করতে পারি,আল্লাহ তায়ালার কাছে এই ফরিয়াদ।

# মু. জামাল উদ্দীন রব্বানী

ইসলামে রাজনীতি ও তাকওয়া

 ভূমিকা ইসলামে রাজনীতি ও রাজনীতিতে তাকওয়া বর্তমান প্রেক্ষাপটে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। বর্তমান দুনিয়ায় ‘ইকামতে দীন’ তথা আল্লাহর আইনপ্রতি...