মুহাম্মদ জামাল উদ্দীন রব্বানী
ভূমিকা
ইসলামে রাজনীতি ও রাজনীতিতে তাকওয়া বর্তমান প্রেক্ষাপটে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। বর্তমান দুনিয়ায় ‘ইকামতে দীন’ তথা আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠার বদলে অসংখ্য মানবগড়া সংগঠন বা মতবাদ গড়ে তুলে যেমন নিজেদের খেয়াল-খুশিমত আইন-কানুন, বিধি-বিধান প্রতিষ্ঠা করে রাষ্ট্র পরিচালনায় ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে, তেমনি তাকওয়াবিহীন ইসলামী রাজনীতিও ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে। তাই আল্লাহর দুনিয়ায় ইকামতে দীন কায়েমে তাকওয়াভিত্তিক কল্যাণকর সফল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা বর্তমান সময়ের অনস্বীকার্য দাবী। নামাযের জন্য যেমন ওযু শর্ত, রাজনীতির জন্য তেমন তাকওয়া শর্ত। শুধু ওযু করলে যেমন নামায আদায় হবেনা, তেমনি ইসলামী শরিয়ত ব্যতিত রাজনীতিও সফল হবেনা।
ইসলামে রাজনীতি
ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা। এটি কোন নিছক ধর্ম নয়। ইসলাম মানবজীবনের প্রতিটি বিভাগের সুসামঞ্জস্যপূর্ণ একটি প্যাকেজের নাম। এখানে এর কোনটি বাদ দেয়ার বা অবহেলার করার সুযোগ নেই। মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাদের সৃষ্টির উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলেন,
“আমি মানবজাতি ও জীন জাতিকে সৃষ্টি করেছি আমার ইবাদতের জন্য।”
( সুরা আয-যারিয়াত : ৫৬)
এখানে ‘ইবাদত’ শব্দটি ব্যাপক অর্থবোধক। মানুষের যাবতীয় কথা, কাজ, আয়-ব্যয় ও পারস্পরিক- সম্বন্ধ, এক নির্ধারিত পন্থা এবং নিয়ম পদ্ধতি অনুযায়ী সুসম্পন্ন হওয়া অপরিহার্য। তা যদি করা হয় তাহলে আল্লাহর মানব সৃষ্ট সংক্রান্ত উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য সার্থক হতে পারে। অন্যথায় মানুষের জীবনে আল্লাহ উদ্দেশ্য পূর্ণ হতে পারে না। মানবজীবন ব্যর্থ ও নিষ্ফল হয়ে যেতে বাধ্য।
সুতরাং আল্লাহর উদ্দেশ্য এবং মানবজীবন সফল হওয়ার জন্য প্রয়োজন আল্লাহর বিধান অনুযায়ী রাষ্ট্র গঠন তথা ইসলামী হুকুমত। নয়তো মানবজীবনও ব্যর্থ হবে, আল্লাহর উদ্দেশ্যও ব্যর্থ হবে, যেটা কাম্য নয়।
একটি কথা খুব ভালোভাবে বুঝা দরকার, যে যেই জিনিসটা তৈরী করে সে সেই জিনিসটি নিখুঁতভাবে পরিচালনা করার নিয়ম জানে। অন্য কেউ তা দক্ষতার সাথে নিখুঁতভাবে পরিচালনা করতে পারবেনা। যেহেতু এ নশ^র পৃথিবী ও তার যাবতীয় সবকিছু মহান আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন সেহেতু এ পৃথিবীতে মানুষ কিভাবে সফল ও সার্থক হবে তার দিক নির্দেশনা তিনি দিয়ে দিয়েছেন এবং আমাদের সেই দিক নির্দেশনা অনুযায়ী চলা একান্ত জরুরী। নচেৎ জীবন যাপন হবে আনাড়ি। ফলে সফলতা লাভ করাও সম্ভবপর হবেনা। মহান আল্লাহ তায়ালা এ ব্যাপারে বলেছেন ,
“ আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন, তদানুযায়ী তাদের বিচার নিষ্পত্তি কর এবং তাদেও খেয়াল-খুশির অনুসরণ কর না।” ( সুরা মায়িদা:৪৯)
এ আয়াতের দ্বারা স্পষ্ট বুঝা যায়, আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন অর্থ্যাৎ কুরআন মজীদ অনুযায়ী শাসনকার্য পরিচালনা করা আবশ্যক, নিজেদেও খেয়াল-খুশি মতো বিধান তৈরী কওে রাষ্ট্র পরিচালনা করা আল্লাহ তায়ালার হুকুমের বাইরে।
ইসলামী শাসন পরিচালনা জন্য তিনি অন্যত্র বলেছেন,
“আমি তো আপনার উপর কিতাব অবতীর্ণ করেছি যেন আপনি আল্লাহ আপনাকে যা জানিয়েছেন তদানুযায়ী মানুষের মধ্যে বিচার-মীমাংসা করতে পারেন।” (সুরা নিসা : ১০৫)
এসকল নির্দেশের পরও যারা রাষ্ট্র পরিচালনায় আল্লাহর অবতীর্ণ কিতাব তথা কুরআন মজীদের বিধান অনুসরণ করে না বরং নিজেদের খেয়াল-খুশি মতো বিধান রচনা করে তাদের সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলে দিয়েছেন,
“ আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন, তদানুযায়ী যারা বিধান দেয় না তারা কাফির।” ( সুরা মায়িদা : ৪৪)
অন্য আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, তারা ফাসিক, তারা যালিম।
তাহলে বুঝা গেল, রাষ্ট্র পরিচালনা বা রাজনৈতিক ব্যবস্থায় মানুষের মনগড়া আইন অচল। আল্লাহ তায়ালার উপর ঈমান আনলেই তাঁর বিধান মেনে চলতে হবে। তাইতো প্রত্যেক নবী-রাসুল পৃথিবীতে এসে মানবজাতিকে আল্লাহর বিধান অনুযায়ী পরিচালিত করার সংগ্রাম করেছেন। যাতে আল্লাহর যমীনে তাঁর দীন প্রতিষ্ঠিত হয় এবং তাঁর আইন এবং বিধান চালু ও কার্যকর হয়।
পবিত্র কুরআন মজীদে উল্লেখ আছে, আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছাড়াও হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম, হযরত মুসা আলাইহিস সালাম, হযরত দাউদ আলাইহিস সালাম এবং সুলাইমান আলাইহিস সালাম আল্লাহর বিধান অনুযায়ী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং তা আদর্শিক মানে পরিচালনা করেছিলেন।
নিউ ও ওল্ড টেস্টম্যান থেকে জানা যায় যে, বনী ইসরাইলের অন্যান্য নবীগণও রাষ্ট্র সংস্থা সংশোধনের চেষ্টা করেছেন এবং ভ্রান্ত নেতৃত্বেও অবাধ সামলোচনা করেছেন।
ইসলামী চিন্তাধারার রাজনীতি বা রাষ্ট্র যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা আল্লাহ তায়ালার নিম্মোক্ত বাণী থেকে বুঝা যায়। হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মক্কায় ইসলামের মিশন প্রচার করে নির্যাতিত হচ্ছিলেন তখন তিনি আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে শিখিয়ে দেয়া এ আয়াতটি বারবার পড়তেন,
“ বল, হে প্রতিপালক! আমাকে প্রবেশ করাও কল্যাণের সাথে এবং আমাকে নিষ্ক্রান্ত করাও কল্যাণের সাথে এবং তোমার নিকট থেকে আমাকে দানকর সাহায্যকারী।” (সুরা
ইমাম হাসান বসরী, ইবনে কাসীর উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, “প্রভু হয় আমাকে রাষ্ট্র ক্ষমতা দান কর, আর না হয় অপর কোন রাষ্ট্রকে আমার সাহায্যকারী বানিয়ে দাও, যেন আমি তার শক্তি ও ক্ষমতার মাধ্যমে পৃথিবীর এই মহাভাংগন ও বিপর্যয়কে সংশোধন করতে পারি। অশ্লীলতা ও নাফরমানীর এই মহাপ্লাবনকে প্রতিরোধ করতে পারি এবং তোমার সুষম আইন ও বিধান চালু ও কার্যকর করতে পারি।”
আল্লাহর বাণীকে সমুন্নত করতে, সঠিক প্রচার, প্রসার ও প্রয়োগ করতে রাষ্ট্র শক্তির যে কোন বিকল্প নেই তা অনুধাবন করেই আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হিজরত করে মদীনা শরীফ এসে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করেন, মদীন সনদ তার পরিকল্পনার একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত বহন করে।
তিনি তার পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করলেন, মুখোমুখি হলেন বিরোধী শক্তির। তবুও দীর্ঘ সংগ্রামের পর মদীনা নামক ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন।
মানবগড়া বিধান কতটা যুক্তিপূর্ণ
বর্তমানে পৃথিবীর প্রায় অধিকাংশ রাষ্ট্র পরিচালিত হচ্ছে মানবগড়া বিধান অনুযায়ী অর্থ্যাৎ মানব রচিত সংবিধান অনুযায়ী। পৃথিবীতে দু’ধরনের সংবিধান রয়েছে। লিখিত সংবিধান ও অলিখিত সংবিধান। উক্ত সংবিধানগুলো লিখিত হোক বা অলিখিত হোক প্রত্যেকটিই মানব রচিত। আর মানব রচিত এ সকল বিধি-বিধান মানুষকে মেনে চলতে হয়। অথচ কোন মানুষ নির্দিষ্ট কোন মানুষকে অনুসরণ করা বা মেনে চলা প্রকৃতিগত, বিবেকগত এবং ইন্দ্রিয়গত কোন দিক দিয়েই যুক্তিপূর্ণ নয়।
প্রকৃতিগত; যাকে আরবীতে তরবিয়্যত বলে। প্রকৃতি বা স্বভাবগত দিক দিয়ে কোন মানুষ কোন মানুষকে অনুসরণ করতে হয়না। কেননা খাওয়া-দাওয়া, উঠা- বসা, চলা-ফেরা, হাসি-কান্না, অনুরাগ-বিরাগ, পেশাব-পায়খানা প্রভৃতি প্রাকৃতিগত এবং স্বভাবজাত বিষয়ে মানুষ কারো অনুসরণের মুখাপেক্ষী নয়। সদ্য প্রসূত শিশুও জন্মের পর হতে এ সকল কাজ করতে পারে অনায়সে। সুতরাং মানুষ যেটা নিজে নিজেই করতে পারে, সেটা কেন সে অন্য মানুষকে অনুসরণ-করে করবে?
বিবেকগত; যাকে আরবীতে আকলিয়্যত বলে। প্রত্যেক মানুষের কিছু না কিছু বিবেক বা আকল আছে। এর দ্বারা মানুষ আকলিয়্যত সম্বন্ধে জ্ঞান লাভ করতে পারে অনায়সে। এ ক্ষেত্রেও মানুষ মানুষের অনুসরণ করার প্রয়োজন পড়েনা। যেমন, দূরে কোথাও ধুঁয়া দেখে প্রত্যেক মানুষই বলতে পারবে যে সেখানে নিশ্চই আগুন লেগেছে। পদচিহ্ন দেখে বলতে পারবে কারো আগমন ঘটেছে এবং আদ্রতা দেখে বুঝতে পারবে এখানে নিশ্চই পানি পড়েছে বা পাশে কোথাও পানি আছে। সুতরাং বুঝা গেল, বিবেক-বিবেচনাগত দিক দিয়ে কোন মানুষ কোন মানুষের অনুসরণ করার দরকার নেই।
ইন্দ্রিয়গত; যাকে আরবীতে বলে হিস্যিয়্যত। ইন্দ্রিয়গত দিক দিয়েও কোন মানুষ কোন মানুষের অনুসরণ করার প্রয়োজন নেই। কেননা, চোখে দেখা, কানে শ্রবণ করা, নাকে ঘ্রাণ নেওয়া, জিহŸা দ্বারা স্বাদ গ্রহণ করা এবং ত্বক দ্বারা ঠান্ডা গরম ইত্যাদি উপলব্ধি করা প্রত্যেক মানুষেরই একই রকম। সুতরাং এখানেও কাউকে অনুসরণ করার দরকার নেই।
এখন প্রশ্ন হলো, মানুষ কাকে অনুসরণ করবে? আমরা জানি, মানুষ সৃষ্টির সেরাজীব। আশরাফুল মাখলুখাত। স্বভাবজাত জ্ঞান, আকল ও ইন্দ্রিয়ানুভূতি যেহেতু স্বল্প-বিস্তর প্রত্যেক মানুষের মধ্যেই আছে তাই এক মানুষ আরেক মানুষের মন-মগজ, চিন্তা-চেতনা থেকে উদ্ভুত আইন-কানুন, বিধি-বিধান গ্রহণ করার কথাটি শুধু অযৌক্তিকই নয়; বরং অবাস্তবও বটে। এতে বুঝা যায়, আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন অর্থ্যাৎ ‘অহী’ই হতে পারে মানুষের একমাত্র অনুসরণযোগ্য। কোন মানুষের তৈরী বিধান কোন মানুষ মানতে পারে না। আল্লাহর অবতীর্ণ বিধান অনুযায়ীই মানুষ পৃথিবীতে পরিচালিত হবে।
একটি প্রশ্ন ও তার জবাব
অনেকেই প্রশ্ন করতে পারেন, মানুষ তো নবী-রাসুলদের অনুসরণ করে থাকেন। এ ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালার এ বাণীটি যথার্থ উত্তর হতে পারে। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন,
“হে ইমানদারগণ ! তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আনুগত্য কর এবং তোমাদের মধ্যে যারা শ্রেষ্ঠ নির্দেশ দাতা তাদের আনুগত্য কর। ( সুরা নিছা : ৫৯)
অর্থ্যাৎ তোমরা তাদের আনুগত্য বা অনুসরণ করতে পারো যারা আল্লাহ তায়ালাকে অনুসরণ করেছে। আয়াতে ও-লিল আর্ম বলতে তাদের বুঝিয়েছেন যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পথ অনুসরণ করেছেন। আল্লাহর পদাঙ্ক অনুসরণকারী যে কাউকে অনুসরণ করা যাবে। কিন্তু যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পথ অনুসরণ করেনি তাদের অনুসরণ করা যাবে না। তাদের রচিত বিধান অনুসরণযোগ্য নয়।
অনেক নামধারী মুসলমান আছেন যারা নামায, রোযা, হজ্জ, যাকাতের মতো কতিপয় ইবাদত পালন করেন, কিন্তু আল্লাহর বিধান অনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালনায় রাজনৈতিক ব্যবস্থা মানেন না। তাদের ব্যাপারে রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিম্মোক্ত হাদিসটি প্রনিধানযোগ্য।
রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
“ আমি তোমাদেরকে পাঁচটি বিষয়ের নির্দেশ দিচ্ছি, আল্লাহ আমাকে ঐগুলো নির্দেশ দিয়েছেন। (বিষয়গুলো হচ্ছে) সংগঠন, নেতার নির্দেশ শ্রবণ, নেতার নির্দেশ পালন, আল্লাহর অপছন্দনীয় সবকিছু বর্জন এবং আল্লাহর পথে জিহাদ। যেই ব্যক্তি ইসলামী সংগঠন ত্যাগ করে এক বিঘৎ পরিমাণ দূরে সরে গেছে সে নিজের গর্দান থেকে ইসলামের রশি খুলে ফেলেছে, তবে সে যদি সংগঠনে প্রত্যাবর্তন করে তো স্বতন্ত্র কথা। আর যেই ব্যক্তি জাহিলিয়্যাতের দিকে আহবান জানায় সে জাহান্নামী।” সাহাবাগণ আরজ করলেন, “ হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, সালাত কায়েম এবং সাওম পালন করা সত্তে¡ও?” আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “সালাত কায়েম, সাওম পালন এবং মুসলিম বলে দাবী করা সত্তে¡ও।” (মুসনাদে আহমদ ও হাকেম)
বুঝা গেল, নামাযা ও সাওম পালন করা মুসলিমও যদি আল্লাহর বিধান বাস্তবায়নে রাজনৈতিক ব্যবস্থা বা সংগঠনভূক্ত না হয়, ইসলামী হুকুমত কায়েমে সচেষ্ট না হয়, তাহলে সে মুসলিম জান্নাতে যেতে পারবেনা। হাদীসের দ্বারা একথাটিও স্পষ্ট হয়ে গেল, আল্লাহর বিধানের বাইরে অন্য মতবাদের (জাহিলিয়্যত) দিকে ধাবিত হলে তার স্থান হচ্ছে জাহান্নাম। আর এখানে সংগঠনের দ্বারা স্পষ্টভাবে ইসলামী রাজনীতির কথা বুঝানো হয়েছে। কারণ ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য ইসলামী রাজনীতি আবশ্যক। এটা আল্লাহ তায়ালার নির্দেশও।
আল্লাহ তায়ালা বলেছেন,
“তোমরা সংঘবদ্ধভাবে আল্লাহর রজ্জুকে (অর্থ্যাৎ ইসলামকে) আকঁড়ে ধরো।” (সুরা ইমরান : ১০৩)
তারপরেও কি আমরা ইসলামী সংঠন বা রাজনীতি নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারি?
মানবগড়া সংবিধান কি শান্তি দিতে পেরেছে?
বর্তমানে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমিসহ বিশে^র প্রায় দেশে মানব রচিত সংবিধান প্রচলিত আছে। প্রশ্ন হলো, এই সংবিধান কি মানব জাতিকে মুক্তি বা শান্তি দিতে পেরেছে? মোটেই না। ১৬শ শতাব্দি থেকে শুরু করে একুশ শতাব্দির বর্তমান পর্যন্ত মানব জীবনে শান্তি স্থাপনের জন্য ব্যাঙের ছাতার মতো মানব সৃষ্ট বহু মতবাদ গড়ে উঠেছে। কিন্তু এসব মতবাদ শান্তি স্থাপনের ও সমস্যা সমাধানের পরিবর্তে জীবনকে করে তুলেছে আরো সংকটময়, সমস্যাসংকুল। ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্র আর ধর্মহীন গণতন্ত্রের স্বাভাবিক পরিণতিতে উদ্ভব হয়েছে চরম নির্যাতনমূলক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা পুঁজিবাদ। এ পুঁজিবাদেও ঘোড়ার দাপটে পিষ্ট হয়েছে মানবতা, নির্যাতিত হয়েছে বঞ্চিতের দল। এখান থেকে মুক্তি পাওয়ার আশায় হেগেল ও ডারউইনের বস্তুবাদেও নির্যাস থেকে মহাত্মা কার্ল মার্কস ‘সমাজবাদ’। তার এ মতবাদে দীক্ষা নিলেন লেলিন ও স্তালিন। তারা অত্যনত আকর্ষনীয়ভাবে তুলে ধরল ব্যক্তি-মালিকানার বিরোদ্ধে যুক্তি। কিন্তু এ অবাস্তব সমাজবাদ মানব জীবনে শান্তি স্থাপনে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। তাই আজ সারা বিশে^ মানব রচিত মতবাদের যাঁতাকল থেকে মুক্তি লাভ করে খোদায়ী জীবন দর্শন ইসলামী আদর্শের বুনিয়াদে জীবন পরিচালনায় উদ্যোগ গ্রহণ করছে।
সমস্যাসংকুল বাংলাদেশ
বর্তমানে কেমন চলছে বাংলাদেশ? কিছু অন্ধ ছাড়া সবাই একবাক্যে বলবে, দেশে গভীর সংকট চলছে। নীতি-নৈতিকতা হারিয়ে রাজা-প্রজা প্রায়ই সবাই একাকার। কেউ ক্ষমতায় থাকায় লড়াই, কেউ ক্ষমতায় যাওয়ার লড়াই, আদতে দেশের মানুষের সুখ-শান্তি তাদের কারোই কাম্য নয়। বর্তমান সরকার কেমন করে ক্ষমতায় এসেছে, বিশেষ করে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারীর নির্বাচন কেমন হয়েছে, তা সচেতন জনগণ মাত্রই জানেন। যে সংবিধানকে তারা ধর্মগ্রন্থের চেয়েও বড় মনে করে, সেটার উপর ১৬ বার ছুরি চালিয়েছে, কিন্তু শান্তি খোঁজে পাইনি। ক্ষমতায় যে যায় সংবিধান তার। সে তার মতো করে সংবিধান সংশোধন করে। এতো সংশোধন-সংযোজন তবুও দেশের মানুষ মুক্তি পাইনি। মেলেনি সোনার হরিণ শান্তিও। শান্তি মেলবে বলে মনেও হয়না। মানুষ এখন বুঝে গেছে, এ সংবিধান নাগরিকদের জন্য নয়, নয় শান্তির জন্যও। এটা কেবল গণতন্ত্রের ধ্বজাধারীদের।
রাজনীতিতে তাকওয়া
এতো অশান্তির মূল কারণ মানবগড়া সংগঠন। পুঁজিবাদ, সমাজবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ বা গণতন্ত্র এসব কিছু মাকাল ফল। কভার আকর্ষণীয়, ভেতরে অন্তসারশূণ্য। কেননা যে সংবিধানে মানুষ মানুষের কাছে জবাবদীহিতার শৃংখলে বন্দি, যেখানে মানুষই সকল ক্ষমতার উৎস, সেখানে ক্ষমতার জোরই প্রাধান্য বিস্তার করবে। এটা যুগে যুগে প্রমাণিত হয়ে আসছে। যদি সবকিছুতে মহা ক্ষমতারধর সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর ভয় থাকত, দুনিয়ার কৃতকর্মের হিসাব পরকালে মহাবিচারক আল্লাহর কাছে দেয়ার বিশ^াস থাকত, সকল ক্ষমতার মালিক মহান আল্লাহকে বলে জানত, তাহলে মানুষে মানুষে ক্ষমতার এত লড়াই চলত না। মানুষ মানুষকে শোষণ করা মহোৎসব চলত না। মানুষের গড়া আইন দিয়ে কখনো মানুষকে শৃংখলিত করা যায়না। এ ক্ষেত্রে আল্লাহর আইন মানব জাতিকে মুক্তি দিত নয়, মানবজাতির শাসকদের করত আল্লাহর প্রতি ভীত। মহান আল্লাহ বলেছেন.
“ তোমরা সর্বদা মহান আল্লাহকে ভয় করতে থাক। কারণ তিনি তোমাদের প্রতিটি নেক আমল ও অন্যায় ক্রিয়াকলাপ সম্পর্কে সম্যক অবগত।” (সুরা হাশর: ১৮)
ইসলামী শাসকরা আল্লাহকে ভয় করে যাবতীয় পাপাচার থেকে নিজেরা যেমন দূরে থাকত, তেমনি দেশ পরিচালনায় প্রজাদের অধিকার সম্পর্কে সতর্ক থাকত এবং অন্যায় কর্মকান্ড থেকে বিরত থাকত।
দ্বিতীয় খলিফা হযরত ওমর রাদ্বিআল্লাহু তায়াল আনহু একটি ঘটনা। তিনি রাষ্ট্রীয় কাজে জেরুজালেম যাচ্ছিলেন, প্রখর সূর্যতাপে মরুভূমির বালুকণা উত্তপ্ত। তাঁর বাহন ছিল একটি উট আর সঙ্গী ছিল একজন ক্রীতদাস। তিনি জেরুজালেম যাওয়ার পথে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার সময় কখনো তিনি উটের পিঠে চড়তেন, কখনো তাঁর ক্রীতদাসকে উটের পিঠে বসিয়ে তিনি উঠের লাগাম ধরতেন। কারণ তাঁর কাছে আল্লাহর ভয় ছিল যে, শুধু তিনিই যদি উঠের পিঠে চড়েন ক্রীতদাসকে লাগাম টানতে দেন তাহলে সেট অমানবিক হবে। এটার জন্য কাল কিয়ামতের ময়দানে মহান আল্লাহর কাছে জবাবদীহি করতে হবে।
বর্ণিত আছে, আমিরুল মোমেনিন হযরত ওমর রাদ্বি আল্লাহু আনহু মহান আল্লাহর ভয়ে মাঝে মাঝে মাটিতে ঢলে পড়তেন।
ইসলামের প্রথম খলিফা হযরত আবু বকর ছিদ্দীক রাদ্বি আল্লাহু আনহু যখন নবীজির বেসাল শরীফের পর ইসলামী দুনিয়ার খেলাপতের দায়িত্ব নিলেন, তখন তাকে রাষ্ট্রের কাজ করতে করতে তাঁর নিজের ব্যবসা বাণিজ্য বন্ধ করে দিতে হয়। ফলে তার পরিবারে অনেক সময় উপোস থাকতে হয়। সাহাবায়ে কেরামগণ ওনাকে বায়তুল মাল থেকে সামান্য ভাতার ব্যবস্থা করতে চাইলে তিনি নারাজ হন। পরবর্তীতে সাহাবাদের অনুরোধে বায়তুল মাল থেকে তাঁর পরিবারে ঐ পরিমাণ আটা পাঠানোর ব্যবস্থা করা যা দিয়ে রুটি বানিয়ে খাওয়া যায়। একদিন খলিফার স্ত্রী তাকে খুবই কাতর সুরে বললেন, হযরত ! বায়তুল মাল থেকে যে পরিমাণ আটা দেয়া হয় তা দিয়ে আপনাকে শুধু শুকনো রুটি বানিয়ে দিতে পারি। আপনি বায়তুল মালের দ্বার রক্ষককে যদি বলতেন, সামান্য আটা বাড়িয়ে দেয়ার জন্য তাহলে তা দিয়ে হালুয়া বানিয়ে দিতে পারতাম। আপনার এই শুকনো রুটি খেতে খুব কষ্ট হয়। খলিফা তাঁর স্ত্রীকে জবাব দিলেন, দেখো, এই আটা আমি খলিফা বলে বেশী ভোগ করতে পারিনা। এগুলো জনগণের হক। তার থেকে আমি এক চুল পরিমাণও বেশী পারিনা।
খলিফার স্ত্রী বুঝতে পেরে চিন্তা করলে কী করা যায়। যিনি সারাদিন ইসলামের কাজ করেন, জনগণের সেবা করেন তাকে একটু ভালো খাবার দিতে পারবোনা তা কেমন করে হয়। পরে তিনি প্রতিদিনকার আটা থেকে সামান্য পরিমাণ আটা তুলে রাখতেন। কিছুদিন পর বেশ কিছু আটা জমা হলে তা দিয়ে হালুয়া বানিয়ে রুটির সাথে খলিফাকে খেতে দিলেন। আর মনে মনে খুব খুশিও হলেন এই ভেবে, যাক অনেকদিন পর প্রাণের স্বামীকে একটু ভালো খাবার দিতে পেরেছেন। কিন্তু যেই খাবার খলিফা দৃষ্টিগোচার হলো সাথে সাথে তিনি স্ত্রীকে জিঙ্ঘেস করলেন, “এই হালুয়া কোত্থেকে বানানো হলো?” স্ত্রী খুশি হয়ে আসল ঘটনাটি খুলে বললেন। পরোক্ষণে খলিফা হযরত আবু বকর রাদ্বি আল্লাহু আনহু বায়তুল মালের রক্ষককে ডেকে বললেন, কাল থেকে যে ঐ পরিমাণ আটা কম দেয়া হয়, কেননা এতদিন এই পরিমাণ আটা কম খাওয়াতে সম্যসা হয়নি, বরঞ্চ তা পেঠের জন্য বেশী হয়ে গিয়েছিল। তার জন্য তিনি আফসোস করতে লাগলেন যে, কাল কিয়ামতের ময়দানে আল্লাহকে কী জবাব দেবেন।
এই হলো ইসলামী শাসক। যারা আল্লাহর ভয়ে সর্বদা তটস্থ থাকতেন। প্রজাদের অধিকারের ব্যপারে খুব সচেতন ছিলেন। অপচয় ও অপব্যয়ের ব্যাপারে খুবই সিরিয়াস ছিলেন।
আজ সময়ের দাবী, গভীর সংকটে নিপতিত আমাদের প্রিয় মাতৃভূমিকে বাঁচাতে, দেশের মানুষের উপর থেকে নির্যাতনের খড়গ নামাতে, দেশে শান্তি-শৃংখলা ফিরিয়ে আনতে, বিশেষত আল্লাহর যমীনে আল্লাহর দীন কায়েম করতে ইসলামী রাজনীতির মাধ্যমে একটি কল্যাণকর খোদায়ী জীবনব্যবস্থা এবং প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শের প্রতিষ্ঠিত শান্তিকামী, কল্যাণকর রাষ্ট্র গঠন কর। এ জন্য দেশের সংখ্যাগরিষ্ট সুন্নী মুসলমানকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে এবং আল্লাহর বিধান বাস্তবায়নে গুরুত্ব বুঝতে হবে। আল্লাহ তাবারকা তায়ালা আমাদের সবাইকে বুঝার তওফিক দিক। আমিন !
No comments:
Post a Comment