Thursday, 1 August 2019

বিশেষ নিবন্ধঃ তৎপর জঙ্গীরাঃ সুন্নীদের ঘুম ভাঙবে কী ?

তৎপর জঙ্গীরাঃ সুন্নীদের ঘুম ভাঙবে কী ?
মুহাম্মদ জামাল উদ্দীন রব্বানী

২৭ আগষ্ট ২০১৪ সাল। ঢাকার রাজাবাজারের নিজ বাসায় এশার নামাযের প্রস্তুতিকালে কথিত ইসলামী হুকুমত প্রতিষ্ঠাকারী জঙ্গীগোষ্ঠির এক গুপ্তঘাতক অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় জঘন্যভাবে এজিদীয় কায়দায় জবেহ করে হত্যা করে আল্লামা শায়খ নুরুল ইসলাম ফারুকী সাহেবকে। তিনি কে পরিচয় দেয়ার দরকার পড়েনা। কারণ এ নির্মম হত্যাকান্ডের সাথে সাথে সারাদেশব্যাপী যে আন্দোলনের দাবানল ছড়িয়ে পড়ে তাতে বুঝা যায় তিনি কত জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব। কারবালায় ইমাম হুসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুর শাহাদাতে যেভাবে হায় হোসাইন হায় হোসাইন রব ওঠেছিল, সেদিন এ বাংলায়ও রব ওঠেছিল ফারকী, ফারুকী বলে। 
এ ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় সারাদেশে বড় বড় প্রতিবাদ সমাবেশ হয়েছে, বিক্ষোভ মিছিল হয়েছে, এমনকি বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রসেনার ডাকে এক ঐতিহাসিক নজিরবিহীন শান্তিপূর্ণ হরতালও হয়েছে। ঘটনার এক বছর অতিক্রান্ত হলেও প্রশাসন এখনো ফারুকীর হত্যাকারীদের সনাক্তও করতে পারেনি। বিচ্ছিন্ন দু’একজনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করেই তাদের দায় সেরেছে। আর সংবাদ মাধ্যমকে  বলেছে এটা জঙ্গীদের কাজ হতে পারে।
এরপূর্বে ঢাকার গোপিবাগে প্রায় একই কায়দায় জবেহ করে খুন করা হয় কথিত এক পীরসহ ৬জনকে। সে পীর নিজেকে ইমাম মাহদী হিসেবে পরিচয় দিত। সেই হত্যার ধরন আর ফারুকী হত্যার ধরন দেখে প্রশাসনসহ অপরাধ বিশ্লেষকরা বলেছেন এ ধরনের ঘটনা জঙ্গীদের পরিকল্পিত হত্যাকান্ড। প্রশাসন সেই কথিত পীরের খুনিদেরও গ্রেপ্তার করতে ব্যর্থ হন। সম্প্রতি একই কায়দায় খুন হন চট্টগ্রামের বায়জীদ এলাকার কথিত ল্যাংটা ফকির ও তার এক ভক্ত। তার পরপর পাবনায় এক খ্রীষ্টান ধর্মযাজককেও গলাকেটে হত্যার চেষ্টা করা হয়। সর্বশেষ ঢাকার বাড্ডা এলাকায় গলাকেটে হত্যা করা হয় পিডিবির সাবেক চেয়ারম্যান রাহমাতিয়া খানকার পীর দাবিদার খিজির খানকে।
সর্বশেষ তিনটা খুনের ঘটনায় যারা গ্রেপ্তার হয়েছে তারা প্রত্যেকেই জঙ্গীগোষ্টি জেএমবির সদস্য এবং তারা এ হত্যাকান্ডগুলোর সাথে জড়িত থাকার কথা স্বীকারও করেছে। চট্টগ্রামে খুন হওয়া কথিত ল্যাংটা ফকিরের খুনের ঘটনায় জড়িতরা বলেছে, ল্যাংটা ফকিরসহ যারা তাদের দৃষ্টিতে শরীয়ত বিরোধী কাজের সাথে জড়িত তাদেরকেই হত্যার সিদ্ধান্ত নিয়েছে জেএমরি নতুন নেতৃত্ব। তারা বলেছে মাজার কেন্দ্রিক শরীয়ত পরিপন্থি কাজকে সমুলে উৎপাটনের লক্ষে তারা নতুন করে সংগঠিত হয়েছে। এ লক্ষ্যে পাহাড়ী এলাকা হিসেবে চট্টগ্রামে তারা শক্ত আস্তানা গেড়েছে। এখানে জেএমবির ২৫০ এহছার সদস্য এবং ২৫০ গায়রে এহছার সদস্য সক্রিয় রয়েছে বলে দাবী করে তারা। ঢাকায় খিজির খানের হত্যায় জড়িত জেএমবি সদস্যরা বলেছে, তারা পীর-ফকির-দরবেশদের টার্গেট করে মাঠে নেমেছে।
আপনারা হয়তো ভুলে গেছেন, গত চার দলীয় জোট সরকারের আমলে সিলেটে শাহ জালাল রাহমাতুল্লাহি আলাইহির ওরশে বোমা হামলাসহ সারাদেশে অসংখ্য মাজার ও পীর ফকিরের আস্তানায় এ জেএমবি জঙ্গীরা হামলা করেছিল। তাদের নেতা বাংলা ভাই ও শায়খ আব্দুর রহমানের ফাঁসি হওয়ার পর তাদের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। এখন আবার নতুন করে সংগঠিত হয়েছে নিষিদ্ধ ঘোষিত ভয়ংকর এ জঙ্গী সংগঠনটি।   
আশংকার কথা হচ্ছে, যদি সত্যিই ধরা পড়া জঙ্গীদের এসব তথ্য সঠিক হয়ে থাকে তাহলে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকবে আমাদের সবচেয়ে শ্রদ্ধা ও সম্মানের স্থান মাজার শরীফ এবং পীর-আলেম সমাজ। যেখানে ফারুকী সাহেবের মতো একজন জনপ্রিয় আলেমকে হত্যা করতে এক বিন্দু পরিমান দ্বিধা করেনি সেখানে আমাদের অন্যান্য পীর-আলেমরা পার পাওয়ার সুযোগ কোথায়। তাদের কাছে ল্যাংটা ফকিরের আস্তানা ও বুজুর্গানে দ্বীনের মাজার শরীফের মধ্যে কোন তফাৎ নাই। সুতরাং ভাববার এখনি সময়। যদিও অনেক সময় আমরা নষ্ট করে এসেছি।
বাতিলদের এত তৎপরতার পরও মনে হয় আমরা ঘুমিয়ে আছি। সেনা- ফ্রন্ট ব্যতিত কারো কোন মাথা ব্যথা আছে বলে পরিলক্ষিত হচ্ছে না। ফারুকীর শাহাদাতের পর চতুর্দিকে ঐক্যের একটা আওয়াজ ওঠেছিল। দরবারীদের মধ্যেও হঠাৎ একটু সচেতনতা লক্ষ্য করা গিয়েছিল। যার প্রমাণ হিসেবে আমরা ২ সেপ্টেম্বর ২০১৪ সালে চট্টগ্রামের লালদীঘিতে ঐতিহাসিক জমায়েত দেখেছি। ঐক্যের কথা শুনেছি। শুনেছি অনেক পরিকল্পনার কথা। কিন্তু যে লাউ সে কদু। কোথায় কে কার ? ঘটনা ঘটলেই আমরা একটু নড়েচড়ে উঠি। তাও আবার সেনা- ফ্রন্ট নড়া চড়া করে বলে। তাদের নিজস্ব কোন কর্মসূচি পরিলক্ষিত হয়না।
সুন্নীয়তের মাঠে অল্পদিনের বিচরণের আমার অভিজ্ঞতায় দেখেছি, আমাদের দরবারীরা নিজস্ব শক্তি অর্জনের চেয়ে যে সরকার ক্ষমতায় থাকে সে সরকারকে কাছে রাখতে চেষ্টা করে। সে সরকারের তাবেদারী করে। এ যেমন পটিয়া আমির ভান্ডার দরবার শরীফের একটি সংগঠনকে দেখলাম চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আ’লীগ নেতা আ জ ম নাছির উদ্দীনকে সংবর্ধনা দিতে। কেন ঐ দরবারী সংগঠনটি মেয়র সাহেবকে সংবর্ধনা দিতে গেল তার কোন যৌক্তিক ব্যাখ্যা আমি খুঁজে পেলাম না। হ্যাঁ, মেয়র যদি পটিয়ার সন্তান বা জামাই হতেন বা তাদের মুরিদ হতেন অথবা ঐ সংগঠনটি আ’লীগের কোন অঙ্গ সংগঠন হতো তাহলে সংবর্ধনা দিলেও কোন আপত্তি থাকতো না। তার মানে, ওনি নগরের ক্ষমতায় এসেছেন, ওনাকে খুশি করে ওনার ক্ষমতাকে ব্যবহার করে ব্যক্তিগত স্বার্থ হাছিল করা, এ ছাড়া আর কি! পীরদের যদি ক্ষমতাসীনদের তোয়াজ করে পীরগীরি করতে হয় তাহলে এ পীরদের কাছ থেকে মাযহাব মিল্লাত কী পাবে? আমার বিশ্বাস, এরা হয়তো সাময়িক কিছু স্বার্থ হাছিল করতে পারবে, কিন্তু জেএমবির মতো জঙ্গীদের কাছ থেকে বাচঁতে পারবে না। আর তাদের মতো ভন্ডদের জন্য ফারুকিদের কাতারের আলেম-পীরদেরও হয়তো হামলার শিকার হতে হবে। তাতে ক্ষতি হবে মাযহাব মিল্লাতের। ক্ষতি হবে সুন্নীয়তের। এক সময় হয়তো এদেশে সুন্নী দাবী করাও কঠিন হয়ে পড়বে। এজন্য সঠিক পীর-মাশায়েখদের এগিয়ে আসতে হবে। হতে হবে ঐক্যবদ্ধ। গড়তে হবে রাজনৈতিক শক্তি। কারণ রাজনৈতিক শক্তি অর্জন ব্যতিরেখে দেশে সুন্নিয়ত প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। প্রিয় নবিজীর  হায়াতে জিন্দেগী এবং খোলাফায়ে রাশেদীনের খেলাফতকাল দেখলে কোন পীর-আলেমই ইসলামী শক্তির বাইরে কোন মানবগড়া মতবাদের সাথে লেয়াজু বা তাদের সমর্থন করতে পারেন না। যারা ইসলামের আদর্শ প্রচারের কথা বলে তারা আবার দুর্বল মানবগড়া মতবাদের ধ্বজাধারী হয় কিভাবে? আমরা যারা মানবগড়া শক্তির সাথে আপোস করিনি, আমরা কি দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছি? নাকি না খেয়ে মরে গেছি। তারাই লেয়াজু করে চলে যাদের আল্লাহর উপর ভরসা নাই। আর যাদের আল্লাহর উপর ভরসা নাই তারা আল্লাহর দ্বীনের দাওয়াত দেওয়ার খানকা খুলে কিভাবে ? আর যদি না বুঝে ঘুমের মধ্যে থাকেন তাহলে তাদের কানে জোরে চিৎকার দিয়ে বলি- জঙ্গী আসছে! জেগে ওঠুন। নইলে আপনাদেরকে ঘুমের মধ্যে জবেহ করে দিবে। 
অতএব, আসুন আমরা আর ঘুমিয়ে না থেকে জেগে ওঠি। নবীর সৈনিকেরা জেগে আছে। পাহাড়া দিচ্ছে দ্বীনের বাগান। কাজ করে যাচ্ছে সুন্নীয়ত প্রতিষ্ঠার। আপনারা কেন ঘুমিয়ে থাকবেন ? জেগে ওঠুন! গা ঝাড়া দিয়ে শামিল হোন সেনার মিছিলে। শুধু খানকায় বসে থেকে এখন আর মদিনায় যাওয়া যায়না, মদিনায় যেতে সেনার কাফেলায় ওঠতে হবে। আশেকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লামা নঈমুদ্দীন আলকাদেরী রাহমাতুল্লাহে আলাইহি তো বলেই গেছেন-
“ অসি হাতে ছুটরে সেনা বুকে পাক কোরান
ভয় করিসনা তোদের প্রতি আল্লাহ মেহেরবান
আয় ছুটে আয় দলে দলে সেনার পতাকায়
এ কাফেলা একমাত্র যাবে মদিনায়।”

No comments:

Post a Comment

ইসলামে রাজনীতি ও তাকওয়া

 ভূমিকা ইসলামে রাজনীতি ও রাজনীতিতে তাকওয়া বর্তমান প্রেক্ষাপটে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। বর্তমান দুনিয়ায় ‘ইকামতে দীন’ তথা আল্লাহর আইনপ্রতি...