শান্তির খোঁজে
মুহাম্মদ জামাল উদ্দীন রব্বানী
ঋতুরাজ বসন্ত শুরু হয়েছে। ডাকতে শুরু করেছে কোকিল। সমুধর কণ্ঠ তার। শীতে ঝরে পড়া পত্র পল্লব পুণঃ অঙ্কুরিত হচ্ছে গাছে গাছে। কনকনে শীতের বদলে এখন মিষ্টি রোদ। প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য্য যেন ঢেলে ঢেলে সাজিয়েছে এ দেশকে। কিন্তু সে সৌন্দর্য্য দেখবে কে ? মানুষের নজর তো মঙ্গল গ্রহের দিকে। পাহাড় থেকে হাতির পাল নেমে আশে পাশের সাজানো গোছানো বাড়ী ঘরকে যেমন পায়ের তলায় পিষ্ট করে দিয়ে চলে যায়, তেমনি কিছু মানুষ নামক পশু রাজনীতির খেলায় এ দেশকে তছনছ করে লুটেপুটে খায় আবার ডিজিটাল করার স্ব্প্ন দেখায়।
সাম্প্রতিক সময়ে সরকারী দল ও বিরোধী দল এমন উন্মত্ত হয়ে ওঠেছে অবস্থা দৃষ্টে মনে হচ্ছে গদি ছাড়া তারা কিছু বুঝেনা। দেশ বা দেশের মানুষ জাহান্নামে যাক তাদের কিছু আসে যায় না। সীমান্তে পাখি মারার মতো মানুষ মারছে বি এস এফ কিন্তু স্থানীয় সরকার মন্ত্রী ও সরকারী দলের সেক্রেটারি বললেন- ’ অতীতেও সীমান্তে মানুষ মরেছে, এখনো মরছে, ভবিষ্যতেও মরবে, এটা নিয়ে সরকার চিন্তিত নয়”। কত বড় দেশপ্রেমিকের মতো কথা! যে দেশের মানুষের জন্য সরকার চিন্তা করেনা সে দেশের মানুষ তাদের ভোট দেয় কেন? এটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। আসলে আমরা জনগণেরও কিছু দোষ আছে। ”কিছু” বললে ভুল হবে, বলতে হবে প্রধান দোষ। যেহেতু আমরাই বলে থাকি ” জনগণই সকল ক্ষমতার উৎস” (ইসলাম বলে আল্লাহই সকল ক্ষমতার উৎস) সেহেতু আমরাই চাইলে এদের কান ধরে নামাতে পারি। কিন্তু প্রশ্ন হলো শূন্যস্থান পুরণ করবে কে ? বিরোধী দল। এরাও তো একই নায়ের মাঝি। ঐ যে বলা হয় ” যে যায় লঙ্কায় সে হয় রাবণ”। ১৯৯১ সাল থেকে এরা দেশকে পালাক্রমে লুটেপুটে খেয়ে আসছে শুধু নয়, একেবারে তছনছ করে দিচ্ছে। আসল কথা হচ্ছে, রাসূলে আরবী (দঃ) বলেছেন- ” যে দেশে নারী নেতৃত্ব দেয় সে দেশ সফলকাম নয়” (বুখারী)।
সুতরাং জনম জনম ধরে মাথা কুটলেও এ শনির রাহু থেকে দেশকে মুক্ত করা সম্ভব নয় যদি নারী পেতনীদের (নেত্রী) কবল থেকে দেশকে উদ্ধার করা না যায়। অনেকেই বলতে পারেন এরশাদ কাকুর কথা। আপনারাই বলুনতো, যে মানুষের হাতে একজন বিবাহিত নারী সুখে থাকতে পারেনা, যে বারবার পরনারীর দিকে ঝুঁকে পড়ে, যাকে নারী পেতনীরাই স্বৈরাচার আখ্যা দিয়েছে, যে ক্ষণে ক্ষণে রূপ বদলায়, তার হাতে দেশ ও দেশের মানুষ নিরাপদ কিনা ? হয়তো কেউ ফিসফিস করে জামাতে ইসলামীর কথা বলতে পারেন। তারা মোটামুটি খারাপ না। শয়তানের বড় ভাই। ইসলামের দোহাই দিয়ে দেশটাকে আবারো পাকিস্থান বানাতে খুব বেশী দেরী করবেনা। এজিদ বাহিনীর কথা মনে পড়ে ? এরা নব্য এজিদ বাহিনী। তাহলে বলতে পারেন, আমরা কোথায় যাব ? কোথাও যাব কেন, যেটা আছে সেটা নিয়ে থাকলে তো অশান্তিতে থাকার কথা নয়। আল্লাহ আমাদের মানুষ বানিয়েছেন, শ্রেষ্ঠ নবীর উম্মত বানিয়েছেন, জীবন চলার জন্য নির্ভেজাল সংবিধান আল কুরআন দিয়েছেন। আমাদের কাছে সব কিছু থাকতে আমরা কেন মুজিববাদ, জিয়াবাদ, মার্কসবাদ, লেলিনবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ ইত্যাদি চরম ব্যর্থ মতবাদগুলোর দিকে যাব ? আসলে আমরা চরম বোকা। অস্ট্রিয়ার ইহুদি একজন সাংবাদিক লিওপোল্ড উইস তার ইসলাম গ্রহণ সম্পর্কে তার বিখ্যাত বই ”ওংষধস ধঃ ঃযব পৎড়ংং-জড়ধফং” এ লিখেছেন- ” ইসলাম এক কুশলী স্থপতির পূর্ণাঙ্গ সৃষ্টির মতো। এর সবগুলো অংশই পরস্পরকে পূর্ণ ও মজবুত করে তোলার জন্য হিসাব করে তৈরি; এতে নেই কোন বাড়তি, নেই কোন ঘাটতি; ফলে এর মাঝে রয়েছে পূর্ণ ভারসাম্য আর মজবুত স্থিরতা”
কিন্তু আমরা চোখ থাকতেও অন্ধ। বিবেক দিয়েছি বিসর্জন। সবচেয়ে দামী হিরা, মানিক, মুক্তা আমাদের কাছে থাকতেও আমরা তা ব্যবহার করছিনা। নজর দিচ্ছি পরের ড্যামেজ মালের দিকে।
লিওপোল্ড উইস পরে যার নাম হয় মুহাম্মদ আসাদ তিনিও মুসলমানদের অধ:পতন ও দূর্দশাগ্রস্থতা দেখেছিলেন। তবুও কেন ইসলাম গ্রহন করেছিলেন ? তাঁর স্বীকরোক্তি - ” মুসলমানদের অতীত ও বর্তমানের মধ্যে সুস্পষ্ট অসামঞ্জস্যে হতভম্ব হয়ে আমি আমার সামনে উপস্থিত সমস্যাকে আরো ঘনিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখবার চেষ্টা করলাম ; মানে আমি নিজকে ইসলামের গন্ডির মধ্যে কল্পনা করবার চেষ্টা করলাম। এটা ছিল নিছক বুদ্ধিবৃত্তি সংক্রান্ত পরীক্ষার ব্যাপার : এবং এর ফলে অল্পকালের মধ্যে আমার কাছে সঠিক সমাধান ধরা পড়ল। আমি উপলব্ধি করলাম যে, মুসলিমদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পতনের একমাত্র কারণ হচ্ছে এই যে, তারা ধীরে ধীরে সত্যিকারের ইসলামী শিক্ষার প্রাণবস্তু অনুসরণে বিরত হয়েছে”।
সত্যিই আজ আমরা ইসলামী শিক্ষা ও আইনের অনুসরণ থেকে যোজন যোজন দূরে আছি। ইসলামের অতীত ইতিহাস অত্যন্ত গৌরবের। সকল বাতুলতা ও জাহিলিয়াতকে পদদলিত করে যে ইসলাম পৃথিবীবাসীকে দিয়েছিলো শান্তির পরশ, সে ইসলাম আজ আমাদের কাছে অপাঙতেয়। তাই তো মুহাম্মদ আসাদ লিখেছেন- ” ইসলাম এখনো রয়েছে ; তা একটি প্রাণহীন দেহ”। এর জন্য দায়ী আমরা মুসলমানরাই। নচেৎ কেন আমরা ইসলামী দুশমনদের ফাঁদে পা দিয়ে ঘরের শান্তিময় পরিবেশ বাদ দিয়ে পরের কৃত্রিম শান্তির খোঁজে ছুটে মরছি ?
১৬শ শতাব্দী থেকে শুরু করে একুশ শতকের এ পর্যন্ত মানব জীবনে শান্তি স্থাপনের জন্য ব্যাঙের ছাতার মতো মানব সৃষ্ট বহু মতবাদ গড়ে ওঠেছে। কিন্তু এসব মানব রচিত মতবাদ শান্তি স্থাপন ও সমস্যা সমাধানের পরিবর্তে জীবনকে করে তুলেছে আরো সংকটময়, সমস্যাসংকুল। ১৬ শতাব্দীতে গীর্জা ও সিংহাসনের সংঘাত জন্ম দিয়েছে ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্র আর এ ধর্মহীন গণতন্ত্রের স্বাভাবিক পরিণতিতে উদ্ভব হয়েছে চরম নির্যাতনমূলক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা পুঁজিবাদ।
লাগামহীন পুঁিজবাদী অর্থব্যবস্থার ঘোড়ার দাপটে পিষ্ট হয়েছে মানবতা, নির্যাতিত হয়েছে বঞ্চিতের দল। অষ্টাদশ শতাব্দী থেকে বিংশ শতাব্দীর প্রথমাংশ পর্যন্ত বিশ্বের কল্যাণকামী চিন্তানায়কগণ এ অবস্থা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য চিন্তা গবেষনা শুরু করলেন। অবশেষে হেগেল ও ডারউইনের চিন্তার উচ্ছিষ্ঠ দ্বান্দিক বস্তুবাদের নির্যাস থেকে মহাতœা কাল মার্কস আবিষ্কার করলেন মুক্তির এক নতুন মতবাদ ” সমাজবাদ”। তাঁর এ মতবাদের দীক্ষা গ্রহণ করলেন লেলিন ও স্তালিন। তারা অত্যন্ত আকর্ষণীয়ভাবে পেশ করলেন ব্যক্তি মালিকানার বিরুদ্ধে যুক্তি। নাস্তিক্যবাদী সমাজবাদ মুক্তি, শান্তি ও প্রগতির শ্লোগান তুলে বিপুল জনগোষ্ঠির মন আকৃষ্ট করলেও শেষ পর্যন্ত তা মানব সমাজে শান্তি স্থাপনে চরম ব্যর্থ হয়। অশান্তির দাবানল জ্বলতে থাকে চতুর্দিকে।
তাই আজ সারা বিশ্বে মানব রচিত মতবাদের যাঁতাকল থেকে মুক্তি লাভ করে খোদায়ী জীবন দর্শন ইসলামী তথা সুন্নীয়তের আদর্শের বুনিয়াদে জীবন পরিচালনার উদ্যোগ গ্রহণ জরুরী শুধু নয় ফরযে আইন। কিন্তু আমরা বিশেষত সুন্নীরা কোন পর্যায়ে আছি ? সত্যি কথা বলতে কী, আমাদের ইসলামী ব্যক্তিত্বদের অধিকাংশই ইসলামের পূর্ণাঙ্গরূপ বাস্তবায়নের তেমন কোন চিন্তাধারায় নেই। যাদেরকে আমরা বাহরুল উলূম বলি, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের কান্ডারী বলি তারা ইসলামের সুফিবাদ, যিকির - আযকার, তসবিহ - তাহলিল, ওরস- ফাতেহা, নজর -নেওয়াজ, ফযিলতি ওয়াজ মাহফিল দাওয়াত ইত্যাদির বেশি কিছু চিন্তা করেন না। তাদের মতে নামায -রোযা, মাযার- ওরস - ফাতেহা, মাহফিলে যাওয়া এটুকুই নিজের জীবনের জন্য যথেষ্ট। কিন্তু ইসলামী আইন কানুন অর্থনীতি, সমাজনীতি, রাজনীতি, সমরনীতি এ গুলোতে তাদের কোন মাথা ব্যাথা নেই। এমনকি খোদায়ী দর্শনের বিপরীত কুফরী ও নবীদ্রোহী শাষন ব্যবস্থায় তারা চলতে বাধ্য হলেও তারপরেও তাদের হৃদমন্দিরে কম্পন হয়না। ধর্মীয় মূল্যবোধের উপর চরম আঘাতে আসলেও তাদের বিবেকে লাগেনা। অথচ তারাঁয় ওয়াজ মাহফিলে মোটা অংকের হাদিয়া গ্রহনের বিনিময়ে মানুষকে জান্নাতে যাওয়ার রূপকথা শুনিয়ে আসেন। মানব জীবনের সংবিধান গ্রন্থ আল কুরআনের তেলাওয়াত ও প্রিয় নবীর আদর্শিক বাণীর সংকলন বুখারীর খতম আদায় করে বালা- মুুসিবত ও দুনিয়াবী ফায়দা অর্জনের পথ দেখান । ইসলামের নামে কোঠি কোঠি টাকা নিজেরা ইনকাম করেন বটে ইসলামের জন্য তারা দুই টাকা খরচ করেননা। ভাগ্যিস, কিছু নির্লোভ, ত্যাগি, প্রজ্ঞাবান আলেম ছিলেন, প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রসেনা, বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট। যাদের কারণে আজ বাংলার বুকে লক্ষ লক্ষ কিশোর ছাত্র যুবক অথৈ সাগরে পালছেড়া নৌকার মতো ভাসতে থাকা ইসলামী নায়ের দাঁড় ধরে আছে। উত্তাল ঢেউ ও চরম ঝড়ের মধ্যেও এ না’ কোন রকম লড়াই করে টিকে আছে। নৌকার মেছাল দিতেও ভয় লাগে। কারণ ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী তথা ধর্মহীনদের একটি বড় অংশ নৌকায় চড়ে বসে আছে। কিছু সুন্নী(?) আওয়ামী আলেমদের নৌকা প্রীতির কারণে আমাদেরকে মুজিববাদী আওয়ামী লীগের বি টিমের অপবাদ দেয়া হয়। ঐ সকল আলেম মনে করে নবীর দুশমন জামাতীদের ঠেকাতে মুজিববাদীদের সাপোর্ট দিতে হবে। নচেৎ তাদের ব্যবসার ক্ষেত্র সুন্নীয়ত টিকবেনা। ওয়াজী ব্যবসা হবেনা। ওয়াজে হামলা হবে। মাযারে ব্যবসা হবেনা। মাযারে বোমা হামলা হবে। এ জন্য তাদের সমর্থন দিতে হবে। কিন্তু আমরা ঘূর্ণাক্ষরেও চিন্তা করিনা আমরা তো এক ্আল্লাহর উপর অটল বিশ্বাস করি। আমরা তাকদিরের ভালো মন্দের উপর বিশ্বাস করি। হায়াত- মউত- রিযিকের মালিক আল্লাহ বলে জানি।আল্লাহর প্রতি যাদের এ বিশ্বাস নেই তারাই শুধু অন্যের উপর ভর করে চলার চেষ্ঠা করেন। তাহলে আামাদের ঈমান কোন পর্যায়ে আছে, তা কি আর কাউকে বলার দরকার আছে ? নামায দোয়াও পড়ি আল্লাহর সংবিধান মাচার উপর তুলে রেখে আবার মানবগড়া মতবাদের দালালীও করি। রাসূলে পাক (দঃ) তাদের ব্যাপারে কী বলেছেন জানেন ? “যে ব্যক্তি ইসলামী সংগঠন ত্যাগ করে এক বিঘত দূরে সরে গেছে সে নিজের গর্দান থেকে ইসলামের রশি খুলে ফেলেছে। তবে যদি সে সংগঠনে প্রত্যাবর্তন করে তা স্বতন্ত্র কথা। সাহাবাগণ আরজ করলেন- হে আল্লাহর রাসূল (দঃ), সালাত কায়েম এবং সাওম পালন স্বত্তেও ? রাসূল (দঃ) বললেন, সালাত কায়েম, সাওম পালন এমনকি মুসলিম দাবী স্বত্তেও। (মুসনদে আহমদ)
সুতরাং এখন দেয়ালে ঠেকে যাওয়া পিঠকে রক্ষা করতে আমাদেরকেই সামনে এগিয়ে আসতে হবে। আমাদের ভান্ডার তো খালি নয়, আমাদের হাতে জীবনের শ্রেষ্ঠ হাতিয়ার ও সংবিধান আল কুরআন এবং হাদীসে নববী রয়েছে। যেটার বলে বলিয়ান হয়ে অসংখ্য সাহাবায়ে কেরম, আউলিয়ায়ে কেরাম, মর্দে মুজাহীদরা ইসলামকে বিশ্বের বুকে প্রতিষ্ঠা করেছে, আমাদেরকেও এগিয়ে যেতে হবে সেই পন্থায়। কারো পিঠে চড়ে শান্তি খোঁজ করতে চাইনা, শান্তি পেতে হলে কোরান ও হাদীসের ভেলায় চড়তে হবে। তবেই পৌঁছবো মুক্তির কাঙ্খিত ঠিকানায়। শান্তির পরশ বইবে তখন সারা বিশ্বময়।

No comments:
Post a Comment