Wednesday, 31 July 2019

প্রবন্ধঃ শিক্ষা ও সাক্ষরতার হার : শিক্ষার বর্তমান অবস্থা পর্যালোচনা

শিক্ষা ও সাক্ষরতার হার : শিক্ষার বর্তমান অবস্থা পর্যালোচনা
মুহাম্মদ জামাল উদ্দীন রব্বানি

৮ সেপ্টেম্বর পালিত হবে ‘সাক্ষরতা দিবস’। দিবসটিকে সামনে রেখে পাঠকের সামনে দেশের বর্তমান শিক্ষার অবস্থা নাতিদীর্ঘভাবে তুলে ধরার প্রয়াস পাচ্ছি। শিক্ষার হার ও সাক্ষরতার হার দুটো এক বিষয় নয়। আবার দুটিকে আলাদা ভাবে দেখারও সূযোগ নেই। কেননা, শিক্ষা ও সাক্ষরতার হারের মাধ্যমে প্রকাশ পাবে একটি দেশের শিক্ষা কতটুকু উন্নতি বা অবনতি করেছে। আর শিক্ষার এই উন্নতি ও অবনতিই বলে দেবে দেশ কতটুকু এগিয়েছে বা পিছিয়েছে।
’সাক্ষরতা’ কি ঃ সাধারণত ‘সাক্ষরতা’ বলতে অক্ষর জ্ঞানসম্পন্নতাকেই বুঝায়। তবে দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে এর পরিধি। এখন শুধু স্বাক্ষর জ্ঞান থাকলেই সাক্ষরতা বলা চলে না। বাংলাদেশের ভৌগলিক পরিসরে “সাক্ষরতা” শব্দের প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় ১৯০১ সালে লোক গণনা অফিসিয়াল ডকুমেন্টে। শুরুতে শুধু নিজের নাম লিখতে জানলেই তাকে স্বাক্ষর বলা হতো। ১৯৪০ সালে এসে সাক্ষরতার পরিধি বাড়িয়ে পড়ালেখার দক্ষতাকে সাক্ষরতা বলা হতো। ষাটের দশকে পড়া ও লেখার দক্ষতার সঙ্গে সহজ হিসাব-নিকাশের যোগ্যতাসম্পন্ন মানুষকে স্বাক্ষর মানুষ হিসেবে পরিগণিত হতো। আশির দশকে লেখাপড়া ও হিসাব-নিকাশের পাশাপাশি সচেতনতা ও দৃশ্যমান বস্তসামগ্রী পঠনের ক্ষমতা সাক্ষরতার দক্ষতা হিসেবে স্বীকৃত হয়। এখন এ সাক্ষরতার সাথে যোগাযোগের দক্ষতা, ক্ষমতায়নের দক্ষতা, জীবন নির্বাহী দক্ষতা, প্রতিরক্ষায় দক্ষতা এবং সাংগঠনিক দক্ষতাও সংযোজিত হয়েছে।
ইউনেস্কোর মতে, একজন সাক্ষরতাসম্পন্ন মানুষ লিখতে, পড়তে, হিসাব করতে এবং বুঝতে পারবেন।  তাদের মতে এ চারটি মানদন্ডের ভিত্তিতে সাক্ষরতা নিরূপন করা হয়। এই সাক্ষরতা দিবসটি চালু করেছে ইউনেস্কো। ১৯৬৫ সালে ৮-৯ সেপ্টেম্বর ইরানের তেহরানে ইউনেস্কোর উদ্যোগে বিশ^ সাক্ষরতা সম্মেলন হয়। ওই সম্মেলনে প্রতিবছর ৮ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস পালনের প্রস্তাব করা হয়। পরে ১৯৬৫ সালে ১৭ নভেম্বর ইউনেস্কো ৮ সেপ্টেম্বরকে আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। সেই থেকে দিবসটি বাংলাদেশসহ পৃথিবীর সকল দেশ পালন করে আসছে।
ইউনেস্কো ও উইকিপিডিয়ার তথ্য মতে,বাংলাদেশের বর্তমান সাক্ষরতা হার ৪৭.৫০ ভাগ। বাংলাদেশ সরকারের হিসাব মতে, এ হার ৬২.৬৬ ভাগ। সাক্ষরতার হার বিবেচনায় বিশ^ র‌্যাংকিং এ বাংলাদেশের অবস্থান ১৬৪তম। প্রথমে রয়েছে জর্জিয়া। আমাদের পাশ^বর্তী দেশ ভারতের অবস্থান ১৪৭তম আর পাকিস্তানের অবস্থান ১৬০। এক্ষেত্রে এ দুই প্রতিবেশী দেশের চেয়েও আমরা পিছিয়ে আছি।
তবে সাক্ষরতার হার নিয়ে সরকার ও এনজিওগুলোর মধ্যে মতনৈক্য আছে। বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন কর্তাব্যক্তিরা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রকম তথ্য দিয়ে থাকে। ২০১৬সালের ০৮ সেপ্টেম্বর স্ক্ষারতা দিবসে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘সাক্ষরতা নিয়ে লেটেস্ট কোনো সার্ভে বা জরিপ নেই। তবে তিনি দাবি করে বলেন, যেহেতু আমার এলাকায় সাক্ষরতা হার একশভাগ, সেটা ধরেই বলতে পারি দেশে সাক্ষরতার হার ৭১ শতাংশ।’
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০১১ সালের সর্বশেষ তথ্য মতে, সাক্ষরতা হার ছিল ৫৮ ভাগ। আর সর্বশেষ বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থা গণসাক্ষরতার অভিযানে (ক্যাম্পে) দেশব্যাপী এক সমীক্ষায় দেখা যায়, সাক্ষরতার হার ৫১ দশমিক ৩০ শতাংশ।  তন্মধ্যে পুরুষের হার ৫০ দশমিক ৫ ভাগ এবং নারী ৫৩ দশমিক ২ ভাগ। এ হিসেব মোতাবেক বলা যায়, দেশে এখনো ৪৮.৭০ শতাংশ মানুষ নিরক্ষর । তরুণদের মধ্যে এই নিরক্ষতার হার প্রায়ই ২৫ শতাংশ।
শিক্ষার হার ঃ প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সরকারের অতিরিক্ত সচিব মোঃ নুরুল আমিন সম্প্রতি নওঁগায় আয়োজিত এক সভায় বলেন, দেশে বর্তমানে শিক্ষার হার শতকরা ৭০ভাগ। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের শিক্ষার হার ছিল ১৬.৮ ভাগ। সে তুলনায় গত ৪৫ বছরে শিক্ষার হার বৃদ্ধি পেয়েছে ৫৩.২ ভাগ। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষার সর্বশেষ ২৮ জুন প্রকাশিত রিপোর্টে দেখা যায়, বাংলাদেশের বর্তমান শিক্ষার হার ৬২.৭ শতাংশ। সরকারী হিসেব (উপআনুষ্টিক শিক্ষা অধিদপ্তর) অনুযায়ী বিগত ৪৫ বছরে সামগ্রিক শিক্ষার হার ১৬.৮% থেকে বৃদ্ধি পেয়ে তা ৬৩% এ উন্নীত হয়েছে। ২০১৩ সালে নারী শিক্ষার ক্ষেত্রে এ হার ৭৮.৮৬%, যা পুরুষ শিক্ষার হার ৭৮.৬৭% থেকেও বেশি।
শিক্ষার বাজেট ও গুণগত মান ঃ শিক্ষা ও সাক্ষরতা হার বাড়লেও শিক্ষার গুণগত মান অর্জনে বাংলাদেশ এখনো পিছিয়ে রয়েছে এবং পরিতাপের বিষয় হলো শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়নে তেমন কোনো বলিষ্ঠ পদক্ষেপ অদ্যাবধি নেওয়া হয়নি। বাংলাদেশের শিক্ষা বাজেটের গতি প্রকৃতি লক্ষ্য করলেই তা সকলের কাছে ¯পষ্ট হয়ে যাবে। বিগত সাত বছরের শিক্ষা বাজেটে গড় বরাদ্দ ছিল মোট বাজেটের ১৩.৭%, যা ২০১০ সালে ছিল সর্বোচ্চ (১৬.৩%)। অন্যদিকে গত দুই দশকে জিডিপি’র মাত্র ২% শিক্ষা খাতে ব্যয় হয়েছে। অথচ ইউনেস্ক’র পরামর্শ অনুযায়ী শিক্ষা বাজেটে বরাদ্দ জাতীয় বাজেটের নূন্যতম ২০ শতাংশ হওয়া ব্যঞ্চনীয় এবং শিক্ষা খাতে ব্যয় মোট জিডিপি’র নূন্যতম ৬ শতাংশ হওয়া উচিত। যা ছাড়া শিক্ষার মানোন্নয়ন সম্ভব নয়।
শিক্ষা খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দের দাবিটিও বিবেচনার দাবি রাখে। এখানে একটি শুভঙ্করের ফাঁকি লক্ষ্য করা যায়। শিক্ষা বাজেটের সাথে প্রযুক্তি, খেলাধুলা, স্বাস্থ্য, ধর্মসহ নানাবিধ খাতকে জুড়ে দেয়া হয়। এমনকি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন বাজেটে সামরিক বাহিনী পরিচালিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহের বরাদ্দও ঢুকিয়ে দেয়া হয়। ফলে বরাদ্দকৃত স্বল্প অর্থটুকুও ভাগাভাগি হয়ে যায় অন্যান্য খাতের সাথে। ২০০৭-০৮ ও ২০১১-১৩ অর্থবছরে শিক্ষার সাথে প্রযুক্তি এবং ২০০৮-০৯ অর্থবছরে শিক্ষা ও প্রযুক্তির সাথে স্বাস্থ্য খাতকেও জুড়ে দেয়া হয়েছিল।
২০১০ সালে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দকৃত ৮৭১২ কোটি টাকার বাজেটের ৭৩৬০ কোটি টাকাই ব্যয় হয়েছে অনুন্নয়ন খাতে, অন্যদিকে উন্নয়ন খাতে ব্যয় হয়েছে ১৩৫২ কোটি টাকা। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে অনুন্নয়ন খাতে এ বরাদ্দ দাড়িয়েছে ১১৮৯৩ কোটি টাকা, অন্যদিকে উন্নয়ন খাতে এ বরাদ্দ দাড়িয়েছে ৩৬৪৭ কোটি টাকা। এতে করে শিক্ষার্থী প্রতি মাথাপিছু ব্যয় এসে দাড়ায় ১২০০ টাকারও নিচে (২০১২ সাল)। ২০১১ সালে শিক্ষার্থী প্রতি মাথাপিছু ব্যয় ছিল ১০০০ টাকারও নিচে। বরাদ্দের ক্ষেত্রে উন্নয়ন খাতকে ক্রমাগত উপেক্ষা করা শিক্ষার মানোন্নয়নের বড় ধরণের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। শিক্ষা অবকাঠামোর দেখভাল, শিক্ষার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় পাঠ্যপুস্তক, শিক্ষা-সহায়ক উপকরণ সরবরাহ ও সর্বোপরি শিক্ষাক্ষেত্রে নিয়োজিত শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন অনুন্নয়ন খাতের অংশ এবং এই ক্ষেত্রগুলোতে বরাদ্দ বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই।
মনে হয় আমরাই একমাত্র জাতি, যারা এ সহজ সূত্রটা বুঝিনা। যদি বুঝতাম তাহলে শিক্ষা নিয়ে এত টালবাহনা হতোনা। একটা শিক্ষানীতি তৈরী করতে আমাদের লেগেছে প্রায় ৪০ বছর। কিন্তু সেটা আজ অবধি বাস্তবতার মুখ দেখেনি। দিতে পারিনি শিক্ষকদের জন্য বেতন-ভাতা। দিতে পারিনি শিক্ষকদের যথাযথ মর্যাদা। তাইতো জাতি গড়ার কারিগররা আজ ক্লাস বন্ধ করে রাস্তায় নেমেছে পড়ে। এটা জাতি হিসেবে আমাদের জন্য কলঙ্কজনক। আজ প্রাইমারি থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সর্বত্র আন্দোলন চলছে মর্যাদা ও বেতন-ভাতার জন্য। কিন্তু সরকার তাদের কথায় কর্ণপাত করছে না। অথচ সরকারের উচিত ছিল শিক্ষকদের সাথে বসে আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টির সুরাহা করতে। তাদের ন্যায্য দাবি মেনে নিয়ে তাদের যথাযথ সম্মান দিতে। সেটা দিতে ব্যর্থ হলে যে দেশ এগুবে না সে কথা পূর্বেই বলা হয়েছে।
পরিশেষে, প্রতিবারের মতো এবারো ‘সাক্ষরতা দিবস’ পালন করবে সরকার। সরকারের বিভিন্ন কর্তাব্যক্তিরা হয়তো বুক ফুলিয়ে আঙুল উঁিচয়ে জোর গলায় বলবেনও, আমরা শিক্ষায় অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছি। সাক্ষরতার হার বাড়িয়ে কাল্পনিক এক তথ্যও দেয়া হবে। বাস্তবের সাথে হয়তো তার মিল পাওয়া দুষ্কর হবে। আমরা আশা করব, সরকার ভাগাড়াম্বর ছেড়ে বাস্তবিকভাবে শিক্ষা ও সাক্ষরতার হার শতভাগে উন্নীত করতে শিক্ষায় বাজেট বৃদ্দি করবেন। শিক্ষকদের মর্যাদা ফিরিয়ে দিবেন। তাহলে সম্ভব দেশকে উন্নত করা। কেননা, সাক্ষরতা একটি দেশের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সাক্ষরতার সাথে শিক্ষার আর শিক্ষার সাথে উন্নয়নের সম্পর্ক রয়েছে। যে দেশে সাক্ষরতার হার বেশী সে দেশ তত উন্নত।

প্রবন্ধঃ অন্ধকার গলিতে দেশের শিক্ষা

অন্ধকার গলিতে দেশের শিক্ষা
মুহাম্মদ জামাল উদ্দীন রব্বানী

গবেষণা সংস্থা বিআইডিএস এর সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ড. নাজনীন আহমেদ মনে করেন ‘শিক্ষার বর্তমান মান প্রশ্নবিদ্ধ।’ ড. নাজনীনের এ মন্তব্যের সাথে সচেতন আম জনতার প্রায় সবাই একমত। হয়তো যারা বর্তমান সরকারের আজ্ঞাবহ বা সমর্থক তারা এর বিরোধীতা করতে পারেন। কিন্তু সত্যিই যদি আজ শিক্ষা বা শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে দৃষ্টি নিরপেক্ষ কোণ থেকে আলোচনা করা হয় এ কথা না মেনে উপায় নেই যে, দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা অজানা এক অন্ধকার গলিতে ঘুরপাক খাচ্ছে।
এ যেমন ধরুন, যুক্তরাজ্যের লন্ডন ভিত্তিক সাপ্তাহিক টাইম্স হায়ার এডুকেশন (টিএইচই) শিক্ষার মান গবেষণাসহ বিভিন্ন মানদন্ডে ২০১৫ সালে এশিয়ার যে ১০০টি মর্যাদাপূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকা প্রকাশ করেছে, তার কোথাও বাংলাদেশের নাম নেই। তার মানে কি দাড়াঁচ্ছে, আমাদের দেশের উচ্চ শিক্ষার মান অন্যান্য দেশের চেয়ে পিছিয়ে। অথচ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড বলা হয়ে থাকে। কিন্তু সেটিও তার মান ও সুনাম ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। আর দেশের অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কথা কী বলব। অথচ এ তালিকায় জাপান ও চীনের প্রাধান্য রয়েছে।এমনকি পাকিস্তানের বিশ্ববিদ্যালয়ও স্থান পেয়েছে। মান থাকবে কোত্থেকে, প্রশাসন থেকে শুরু করে শিক্ষক পর্যন্ত সব যদি দলীয়করণ করা হয়? এখানে মেধাবীদের স্থান কোথায়? বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের গবেষণাখাতে যথেষ্ট বরাদ্দ নেই। আবার যা আছে তা দিয়ে শিক্ষকরাও বিদেশ ভ্রমন করেন। ক্লাস করেন না নিয়মিত। শহীদ হালিম লিয়াকত স্মৃতি বৃত্তি পরীক্ষার এক পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষক (নাম অনুল্লেখ্য) গর্ব করে বলেছেন, ‘তিনি ৪টি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ান’। একজন শিক্ষক যদি একসাথে ৪টি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ান তাহলে প্রশ্ন থেকে যায়, তিনি তার বিশ্ববিদ্যালয়ে কয়টা ক্লাস নেন? বা আদৌ তিনি নিয়মিত ক্লাস নেন কিনা। এ রকম অবস্থা দেশের প্রায় সব বিশ্ববিদ্যালয়ে। তবে একটা বাস্তব কথা, মেধাবী শিক্ষকদের শিক্ষকতা পেশায় আনতে হলে তাদের ভালো সম্মানী ও মর্যাদা দিতে হবে। যা দিতে সরকার ব্যর্থ হয়েছে। যার ফলশ্রুতিতে দেশের সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা ক্লাস বন্ধ করে একযোগে আন্দোলনে নেমেছে। কিন্তু সরকার তাতে মাথা ঘামাচ্ছেনা। অধিকন্তু সরকারের অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত শিক্ষকদের জ্ঞানের অভাব আছে বলে মন্তব্য করেন। অর্থমন্ত্রী মহোদয়ের এ মন্তব্য যদিও পরের দিন প্রত্যাহার করে নিয়েছেন তবুও একটা প্রশ্ন থেকে যায়, সরকার যদি জানে যে, সত্যিই শিক্ষকদের জ্ঞানের অভাব আছে, তাহলে তারা জ্ঞানী তথা মেধাবীদের শিক্ষকতা পেশায় আনার চেষ্টা করছেন না কেন? কেননা তারা জানে, শিক্ষকদের যে বেতন ও মর্যদা দেয়া হচ্ছে তাতে মেধাবীরা এ পেশায় আসবে না। শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ে নয়, দেশের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্কুল-কলেজগুলোতেও একই সমস্যা। ইউরোপে সহযোগিতা এবং উন্নয়ন সংস্থা ওইসিডি বলছে, ৭৬ টি দেশের স্কুলগুলোর ফলাফলের ভিত্তিতে উন্নতমানের শিক্ষায় সিঙ্গাপুর শীর্ষে। এখানেও বাংলাদেশের অবস্থান নেই। এর চেয়েও ভয়াবহ তথ্যা রয়েছে প্রাথমিক শিক্ষায়। শিক্ষা নিয়ে আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা রুম টু রিড বাংলাদেশ এর গবেষণা প্রতিবেদনে জানিয়েছেন- বাংলাদেশে প্রথম শ্রেণী উত্তীর্ণ শিশু শিক্ষার্থীদের প্রায় ৩২ শতাংশই বাংলা একটি শব্দও উচ্চারণ করে পড়তে পারেনা! আর দ্বিতীয় শ্রেণী উত্তীর্ণদের প্রায় ১৬ শতাংশই বাংলা একটি শব্দও উচ্চারণ করে পড়তে সক্ষম নয়! এ যদি হয় আমাদের শিক্ষার্থীদের অবস্থা তাহলে স্বভাবতই প্রশ্নবিদ্ধ শিক্ষার মান।
সম্প্রতি বিবিসি বাংলার সংলাপে একজন দর্শক বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী জনাব শাহরিয়ার আলমের কাছে এক প্রশ্ন করেন,“ বাংলাদেশে শিক্ষার স্তরগুলোতে যে মান রয়েছে তা ভবিষ্যতে দেশের জনগোষ্ঠিকে দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করতে কি যথেষ্ট ভূমিকা রাখতে পারবে ?” তাঁর উত্তরে তিনিও স্বীকার করে নিয়েছেন যে শিক্ষার বর্তমান মান ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের জন্যে যথেষ্ট নয়। তবে সরকার নানা পদক্ষেপ নিচ্ছে এ পরিস্থিতির উত্তরণ ঘটাতে।
একই অনুষ্টানে অংশ গ্রহণ করে ড. আসাদুজ্জামান রিপন বলেন, দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা খুবই নাজুক পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে। এর জন্য শিক্ষকদের অবমূল্যায়নকে দায়ী করেন তিনি। তিনি বলেন, যদি শিক্ষকদের আকর্ষণীয় বেতন-ভাতা দেয়া যেত তাহলে মেধাবীরা এ পেশায় আসত এবং শিক্ষার মান বাড়ত।
মোদ্দাকথা, শিক্ষার সর্বোচ্চ অঙ্গন থেকে প্রাথমিক লেভেল পর্যন্ত সবখানে শিক্ষার মান নিম্মগামী। এ পশ্চাতপদতা জাতির জন্য কলঙ্কজনক। এটা জাতির উন্নতির পথে অন্তরায়। শিক্ষার উন্নতির সাথে অর্থনৈতিক উন্নতি জড়িত। এটা সিঙ্গাপুরের দিকে দেখলে স্পষ্ট বুঝা যায়। ১৯৬০ সালেও তারা অর্থনৈতিক দিক দিয়ে অনেক পিছিয়ে ছিল।
শিক্ষায় উন্নতির সাথে সাথে তাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও বাড়তে থাকে।
ওইসিডি-র রিপোর্টে বলা হয়েছে, কোন দেশের শিক্ষার গুণগত মানই বলে দেবে সে দেশ অর্থনৈতিক দিক থেকে কতটুকু সফল হবে। দুর্বল শিক্ষা নীতি এবং ব্যবস্থার ফলে অনেক দেশের অর্থনীতি এক ধরনের স্থায়ী মন্দার মধ্যে
আটকে থাকে । শিক্ষা ব্যবস্থা উন্নত করলে অসাধারণ দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক সাফল্য আসবে।
সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক উন্নয়নের মাধ্যমে সমাজে মৌলিক পরিবর্তন আনার ক্ষেত্রে শিক্ষায় মূল ভূমিকা পালন করে থাকে। সরকারী হিসেব (উপআনুষ্টিক শিক্ষা অধিদপ্তর) অনুযায়ী বিগত ৪৫ বছরে সামগ্রিক শিক্ষার হার ১৬.৮% থেকে বৃদ্ধি পেয়ে তা ৬৩% এ উন্নীত হয়েছে। ২০১৩ সালে নারী শিক্ষার ক্ষেত্রে এ হার ৭৮.৮৬%, যা পুরুষ শিক্ষার হার ৭৮.৬৭% থেকেও বেশি।
কিন্তু শিক্ষা ক্ষেত্রে বাংলাদেশের এ সাফল্য ইতিবাচক হলেও শিক্ষার গুণগত মান অর্জনে বাংলাদেশ এখনো পিছিয়ে রয়েছে এবং পরিতাপের বিষয় হলো শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়নে তেমন কোনো বলিষ্ঠ পদক্ষেপ অদ্যবধি নেওয়া হয়নি। বাংলাদেশের শিক্ষা বাজেটের গতি প্রকৃতি লক্ষ্য করলেই তা সকলের কাছে ¯পষ্ট হয়ে যাবে। বিগত সাত বছরের শিক্ষা বাজেটে গড় বরাদ্দ ছিল মোট বাজেটের ১৩.৭%, যা ২০১০ সালে ছিল সর্বোচ্চ (১৬.৩%)। অন্যদিকে গত দুই দশকে জিডিপি’র মাত্র ২% শিক্ষা খাতে ব্যয় হয়েছে। অথচ ইউনেস্ক’র পরামর্শ অনুযায়ী শিক্ষা বাজেটে বরাদ্দ জাতীয় বাজেটের নূন্যতম ২০ শতাংশ হওয়া ব্যঞ্চনীয় এবং শিক্ষা খাতে ব্যয় মোট জিডিপি’র নূন্যতম ৬ শতাংশ হওয়া উচিত।
শিক্ষা খাতে সর্বোচ্চ বারাদ্দের দাবিটিও বিবেচনার দাবি রাখে। এখানে একটি শুভঙ্করের ফাঁকি লক্ষ্য করা যায়। শিক্ষা বাজেটের সাথে প্রযুক্তি, খেলাধুলা, স্বাস্থ্য, ধর্মসহ নানাবিধ খাতকে জুড়ে দেয়া হয়। এমনটি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন বাজেটে সামরিক বাহিনী পরিচালিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহের বরাদ্দও ঢুকিয়ে দেয়া হয়। ফলে বরাদ্দকৃত স্বল্প অর্থটুকুও ভাগাভাগি হয়ে যায় অন্যান্য খাতের সাথে। ২০০৭-০৮ ও ২০১১-১৩ অর্থবছরে শিক্ষার সাথে প্রযুক্তি এবং ২০০৮-০৯ অর্থবছরে শিক্ষা ও প্রযুক্তির সাথে স্বাস্থ্য খাতকেও জুড়ে দেয়া হয়েছিল।
২০১০ সালে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দকৃত ৮৭১২ কোটি টাকার বাজেটের ৭৩৬০ কোটি টাকাই ব্যয় হয়েছে অনুন্নয়ন খাতে, অন্যদিকে উন্নয়ন খাতে ব্যয় হয়েছে ১৩৫২ কোটি টাকা। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে অনুন্নয়ন খাতে এ বরাদ্দ দাড়িয়েছে ১১৮৯৩ কোটি টাকা, অন্যদিকে উন্নয়ন খাতে এ বরাদ্দ দাড়িয়েছে ৩৬৪৭ কোটি টাকা। এতে করে শিক্ষার্থী প্রতি মাথাপিছু ব্যয় এসে দাড়ায় ১২০০ টাকারও নিচে (২০১২ সাল)। ২০১১ সালে শিক্ষার্থী প্রতি মাথাপিছু ব্যয় ছিল ১০০০ টাকারও নিচে। বরাদ্দের ক্ষেত্রে উন্নয়ন খাতকে ক্রমাগত উপেক্ষা করা শিক্ষার মানোন্নয়নের বড় ধরণের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। শিক্ষা অবকাঠামোর দেখভাল, শিক্ষার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় পাঠ্যপুস্তক, শিক্ষা-সহায়ক উপকরণ সরবরাহ ও সর্বোপরি শিক্ষাক্ষেত্রে নিয়োজিত শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন অনুন্নয়ন খাতের অংশ এবং এই ক্ষেত্রগুলোতে বরাদ্দ বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই।
মনে হয় আমরাই একমাত্র জাতি যারা এ সহজ সূত্রটা বুঝিনা। যদি বুঝতাম তাহলে শিক্ষা নিয়ে এত টালবাহনা হতনা। একটা শিক্ষানীতি তৈরী করতে আমাদের লেগেছে প্রায় ৪০ বছর। কিন্তু সেটা আজ অবধি বাস্তবায়ন করতে পারিনি। দিতে পারিনি শিক্ষকদের জন্য বেতন-ভাতা। দিতে পারিনি শিক্ষকদের যথাযথ মর্যাদা। তাইতো জাতি গড়ার কারিগররা আজ ক্লাস বন্ধ করে রাস্তায় নেমেছে পড়ে। এটা জাতি হিসেবে আমাদের জন্য কলঙ্কজনক। আজ প্রাইমারি থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সর্বত্র আন্দোলন চলছে মর্যাদা ও বেতন-ভাতার জন্য। কিন্তু সরকার তাদের কথায় কর্ণপাত করছে না। অথচ সরকারের উচিত ছিল শিক্ষকদের সাথে বসে আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টির সুরাহা করতে। তাদের ন্যায্য দাবি মেনে নিয়ে তাদের যথাযথ সম্মান দিতে। সেটা দিতে ব্যর্থ হলে যে দেশ এগুবে না সে কথা পূর্বেই বলা হয়েছে।
শিক্ষকদের আন্দোলনে ক্লাস না হওয়া, সরকারী অবহলোয় শিক্ষা ব্যবস্থায় দূরাবস্থা সব মিলিয়ে শিক্ষা ও শিক্ষা ব্যবস্থা এক অন্ধকার গলিতে ঘুরপাক খাচ্ছে। তলিয়ে যাচ্ছে জাতির উন্নতির সুন্দর রাস্তা।এটা হতে দেয়া যায়না। এভাবে চলতে পারেনা দেশের শিক্ষা ব্যস্থা। অন্তত এবারের বাজেটে শিক্ষাখাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি করে সরকার যেন শুভবুদ্ধির পরিচয় দেয় এ প্রত্যাশা করছি।


প্রবন্ধঃ শিক্ষায় দ্বৈতনীতি অগ্রহণযোগ্য


শিক্ষায় দ্বৈতনীতি অগ্রহণযোগ্য
মুহাম্মদ জামাল উদ্দীন রব্বানি


চিরসত্য প্রবাদ ; শিক্ষায় জাতির মেরুদন্ড। মেরুদন্ড ছাড়া যেমন মানুষ চলতে পারেনা, তদ্রুপ  শিক্ষা ছাড়া জাতি অচল। জাতিকে উন্নতির সুউচ্চ শিখরে পৌঁছাতে তাই শিক্ষা প্রসারের বিকল্প নাই। আর এ শিক্ষা প্রসারের কাজ কারো একার নয়। এর সাথে জড়িত সরকার, শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং জনগণ। ব্যক্তিকেন্দ্রিক শিক্ষার প্রসার ঘটে বটে, তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় নিতান্তই অপ্রতুল। শুধু শিক্ষা প্রসার ঘটালে তো হবেনা তার মানও থাকা চাই। যেনতেন শিক্ষা দিয়ে দেশ ও জাতির কল্যাণ সাধন আকাশ কুসুম কল্পনা। এখানে সরকার্রে ঐকান্তিক প্রচেষ্টার সাথে শিক্ষকদের সদিচ্ছা ও শিক্ষার্থীদের মনোযোগী হতে হবে। আর জনসাধারণের হতে হবে সচেতন।
কিন্তু বর্তমানে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা যেন রাজনীতির সস্তা জনপ্রিয়তা অর্জনের মতো। এখানে সরকার শিক্ষাব্যবস্থায় উন্নতি চায় বটে, তবে তা ‘তেল ছাড়া মচমচে’ খাওয়ার মতো। দেশ স্বাধীনের ৪০ বছর পর বাম-ডানের ঘঁষাঘঁিষ করে অনেক চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে ২০১০ সালে একটি শিক্ষানীতি প্রণয়ন  করেছে। তা বাস্তবায়নের প্রক্রিয়াও চলছে। কিন্তু তাতে সরকারের বড় ধরনের গলদ রয়েছে। কারণ সরকার শিক্ষানীতি বাস্তবায়ন করতে চায় কিন্তু বাস্তবায়নকারীদের ন্যায্য দাবী পূরণ করতে চায়না। দেশে সরকারী - বেসরকারী দু’ধরনের শিক্ষাব্যবস্থায় বিস্তর ফারাক রেখে আদৌ শিক্ষানীতি বাস্তবায়ন করতে পারবে কিনা সন্দেহ। এক দেশে দুইনীতি গ্রহনযোগ্য নয়। শিক্ষার মতো গুরুত্বপুর্ণ জায়গায় যদি সরকার ইনভেস্ট করতে না পারে তবে অন্য জায়গাগুলোতে ইনভেস্ট বা গুরুত্ব দেয়া হাস্যকর। অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়া সুচ খুজঁতে আলোর দরকার হয়। আর সে আলো যদি মিটিমিটি জ্বলে, তা দিয়ে কাজ হয়না। ফকফকে আলোর দরকার হয়। সরকার শিক্ষা খাতের এক বড় অংশকে বেসরকারী করে রেখে অন্ধকারে মিটিমিটি আলো দিয়ে সুচ খুঁজতে চেষ্টা করছে।
শিক্ষা গবেষক ড. সিদ্দিকুর রহমান “শিক্ষার মান বাড়াতে হলে” শিরোনামে একটি নিবন্ধে লিখেছেন- ‘শিক্ষার মান বাড়াতে হলে শিক্ষকদের মান বাড়াতে হবে। মেধাবী শিক্ষক ছাড়া শ্ক্ষিার মান বৃদ্ধি সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে মেধাবীদের শিক্ষকতা পেশায় আনতে হলে অবশ্যই তাদের ভালো বেতন-ভাতা দিতে হবে।” তিনি তাঁর অভিজ্ঞতা বর্ণনাপূর্বক লিখেন, “পাশ্ববর্তী দেশ ভারতেও শিক্ষকদের বেতন-ভাতা সম্মানজনক। আর চীনেও যে উচ্চ বেতন-ভাতা দেয়া হয়, তাতে সেদেশের শিক্ষকরা সন্তুষ্ট।”
কিন্তু দূর্ভাগ্যের বিষয় হলো, আমাদের সরকারের নীতিনির্ধারকরা তা বুঝেও না বোঝার ভান করছেন। বর্তমান সরকার ২০০৮ সালের নির্বাচনী ইশতিহারে শিক্ষকদের জন্য আলাদা বেতন-ভাতা কাঠামো গঠন করার ঘোষনা দিয়েছিল। কিন্তু সেই সরকারের মেয়াদ শেষ করে পুণরায় ক্ষমতা দখল করার পরও তা বাস্তবায়ন করেনি। অথচ সরকার শিক্ষা খাতে ব্যাপক সাফল্যের কথা প্রচার করে আসছে। সাফল্য যে একেবারে নেই তা বলবনা। তবে সেটা ঐ মিটিমিটি আলো দিয়ে নিকষ কালো অন্ধকারে সুচ খোঁজার মতো।
গত বছর সরকার দেশের ২৬ হাজার ২০০ বেসরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ১লাখ ৪ হাজার শিক্ষকের চাকুরী জাতীয়করণ করেছে। তবে এজন্য অনেক আন্দোলন-সংগ্রাম করতে হয়েছে প্রাথমিক শিক্ষকদের। এমনকি তার জন্য একজন শিক্ষককে প্রাণ বিসর্জন দিতেও হয়েছে। কিন্তু এখনো অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা বেতন-ভাতা উত্তোলন করতে পারেনি। অন্যদিকে এমপিওভূক্ত বেসরকারী স্কুল, কলেজ শিক্ষক-কর্মচারী প্রায় সব সংগঠনগুলো তাদের চাকুরী জাতীয়করণসহ বিভিন্ন দাবীতে আন্দোলন করছে। বিশেষ করে সামনের জুলাইয়ে ঘোষিত হতে যাওয়া নতুন পে-স্কেলে শিক্ষকদের বেতন বৃদ্ধির বিষয়টি সরকার নিশ্চিত না করায় শিক্ষকদের মধ্যে একটা চাপা ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। তারা যেকোন কঠিন আন্দোলনে নামতে পারে যেকোন সময়। একদিকে সরকার কিছু প্রাথমিক বিদ্যালয়কে জাতীয়করণ করল অন্যদিকে শতকরা ৮০ভাগ বেসরকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের লক্ষ লক্ষ শিক্ষকের ন্যায্য দাবী, সময়ের গুরুত্বপূর্ণ দাবীকে পুলিশের লাঠি দিয়ে গুড়িয়ে দিল। এ চরম বৈষম্য ও দ্বৈতনীতি সত্যিই ন্যাক্কারজনক।
বছরের প্রথমদিন শিক্ষার্থীদের হাতে বই তুলে দিয়ে আর পরীক্ষার খাতায় ভুলের মধ্যেও জোরপূর্বক নাম্বার দিয়ে পাশের হার বাড়িয়ে শিক্ষার ক্ষেত্রে সস্তা জনপ্রিয়তা হাসিল করা যায়, জনগণকে ধোঁকা দেয়া যায়। কিন্তু আসল কর্ম সাধিত হয়না। হাজার হাজার এ প্লাস অথচ ভর্তির জন্য কলেজে সীট নাই। ভুরিভুরি পাশ অথচ ততটুকু মান নাই। অথচ সরকারের হাক ডাকের শেষ নাই। এই শিক্ষা দিয়ে কী হবে !
শিক্ষাকে কলুষমুক্ত করতে বিদ্যালয়ে কোচিং / প্রাইভেট বন্ধ করল, অথচ বাজারে বাজারে নিম্নমানের অদক্ষ শিক্ষকের চটকদারী সাইনবোর্ডে কোচিং বাণিজ্য ঠিকই চলছে। আর এ কোচিং বাণিজ্যের সাথে সবচেয়ে বেশী জড়িত সরকারের চোখের বিষ জামায়াত-শিবিরের কর্মীরা। সরকার একদিকে যুদ্ধপরাধী জামায়াত শিবির দমন করছে আর অন্য দিকে আসল শিক্ষকদের বঞ্চিত করে জামায়াত শিবির পরিচালিত কোচিং সেন্টারগুলোকে বাণিজ্য করার  সুযোগ দিচ্ছে। এমন দ্বৈতনীতি বড়ই স্যেকুলার। 
শিক্ষার ক্ষেত্রে দ্বৈতনীতির ফলে কত বড়রকমের বৈষম্য সৃষ্টি হয়েছ তা বুঝতে বড় কোন বুদ্ধিজীবি হওয়ার প্রয়োজন নেই। নিচের পার্থক্যটি পড়লে বুঝতে পারবেন।
একজন বেসরকারী স্কুল শিক্ষক এবং একজন সরকারী স্কুল শিক্ষক একই সময়ে একই স্কেলে শিক্ষকতা পেশায় যোগদান করে কয়েক বছর চাকুরী করার পর দেখা যায় সরকারী স্কুল শিক্ষকটি বেসরকারী স্কুল শিক্ষকের তুলনায় ৩ থেকে ৪ গুণ বেশী বেতন-ভাতা পাচ্ছেন। বেসরকরী স্কুল শিক্ষকটি যেই তিমিরে ঢুকেছিল সেই তিমিরে থেকে যায়। দু‘একটি তথ্য দিলেই এ বৈষম্যটা আরো স্পষ্ট হবে।  একজন সরকারী শিক্ষক বছর বছর ইনক্রিমেন্ট পান কিন্তু একজন বেসরকারী শিক্ষক পান সারা জীবনে একবার। অথচ দুজনের কর্মদায়িত্ব এক। বেসরকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পিয়ন থেকে অধ্যক্ষ পর্যন্ত সারাজীবনে নির্ধারিত বাড়ী ভাড়া মাত্র ৫০০ টাকা। কী লজ্জাজনক ! অথচ সরকারী শিক্ষকদের মূল বেতনের ৪০% বাড়ী ভাড়া দেয়া হয়। বেসরকারী শিক্ষকরা চিকিৎসা ভাতা পান মাসে মাত্র ৩৫০টাকা। আচ্ছা বলুন তো এই টাকা দিয়ে ডাক্তার কেন একজন কবিরাজ দেখানোও সম্ভব কিনা। এভাবে হিসাব দিলে বৈষম্যের ফারাক শুধু দীর্ঘায়িত হবে।
আসলে সরকারের এ অবস্থা দেখে আমার বাড়ীর পাশে এক ভদ্রলোকের কথা বারবার  মনে পড়ে। তিনি ধান কাটা ও রোপনের সময় বাজার থেকে কামলা এনে দিনের পর দিন বিরতীহীন কাজ করাতেন। আর যাওয়ার সময় হলে মাইনে দিতেন বাজারমূল্যের অর্ধেক । কাজে গন্ডগোল হলে পিটাও দিতেন আর মাইনে কম হওয়ার কথা বললে মাইনে ছাড়াই তাড়িয়ে দিতেন। এখন আমাদের সরকারের অবস্থাও প্রায় এই রকম। শুধু এ সরকার কেন, সবার অবস্থা ‘যে যায় লঙ্কায়, সে হয় রাবণ’।
সবশেষে বলব, দেশের শতকরা ৮০ভাগ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে বেসরকারী খাতে রেখে, শিক্ষক সমাজের মধ্যে মর্যাদা ও বেতন-ভাতার বৈষম্য বাড়িয়ে, দ্বৈতনীতির শিক্ষাব্যবস্থা জাতির কাঙ্খিত ফল দেবেনা। শিক্ষা একটি মৌলিক অধিকার। এ অধিকার প্রতিষ্ঠায় শিক্ষাকে জাতীয়করণ শুধু সময়ের দাবী নয় বরং এটা জাতির প্রধান অধিকার। এ অধিকার সরকারকেই বাস্তবায়ন করতে হবে। সরকারের শুভ বুদ্ধির উদয় হোক।  

সাম্প্রতিকী

থাকো তোমরা চেয়ে
"""""""""'''''''''''''''
একুশ সালের মধ্যেই দেশ
করতে ডিজিটাল,
গণতন্ত্রের গোড়ায় গোড়ায়
গরুর গোবর ঢাল।

উন্নত এক গণতান্ত্রিক
গড়তে চাইলে দেশ,
অন্য সব দলগুলোরে
করতে হবে শেষ।

জোটও হবে ভোটও হবে
দেখবে বিশ্ববাসী,
ভোটের আগের রাতেই ভোট
দেব হাসি হাসি।

চকিদার থেকে চেয়ারম্যান
এমপি কিংবা ডাকসু,
ডিজিটালের ছোয়াঁই চলবে
দিনের বেলায় নাইটশো।

চোখের সামনে ঘটবে এসব
খুলবে না মুখ কেউ,
কুত্তা বাহিনী লাগিয়ে দেবো
কী ভয়ংকর ঘেউ ঘেউ।

এদেশ আমার বাবার কেনা
আমি তারই মেয়ে,
আমিই এদেশ করবো শাসন
থাকো তোমরা চেয়ে।

কবিতাঃ লাখো সেনানী কেঁদে জার জার

লাখো সেনানী কেঁদে জার জার
"""""""""""""""''''"'""""""""""""""""""""
ইফতেখার,
লাখো সেনানী কেঁদে জার জার,
তোমার শূণ্যস্থান নয় পূরণ হবার।

ইফতেখার,
মতিন নামেই তুমি ছিলে বাড়িতে প্রিয় সবার।
তোমাকেই তারা ভাবত সুন্নিয়তের রাহবার।

ইফতেখার,
শুধু একটি পরিবারের স্বপ্ন হলোনা ছারখার,
পুরো সুন্নি পরিবারের স্বপ্ন যেন ভেঙে একাকার।

ইফতেখার,
আমাদের স্কুলে কি আসবে না আর?
আমাকে শক্তি আর সাহস যোগাবে কে আর?

ইফতেখার,
আমার বিপদে ছুটে কি আসবেনা আর?
ইফতেখার, ও ইফতেখার, ভাই ইফতেখার।

লিমেরিক-১



বিষাদের ছায়া

সাতাশ আগষ্ট সন্ধ্যা ছ'টা ত্রিশ মিনিট পর
দেশজুড়ে বয়ে গেল প্রলয়ংকরী এক ঝড়
জবাই করে হত্যা করলো ফারুকীকে
প্রতিবাদের আগুন জ্বললো চারিদিকে
বিষাদের ছায়া আসলো নেমে সুন্নীদের উপর।

ইসলামে রাজনীতি ও তাকওয়া

 ভূমিকা ইসলামে রাজনীতি ও রাজনীতিতে তাকওয়া বর্তমান প্রেক্ষাপটে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। বর্তমান দুনিয়ায় ‘ইকামতে দীন’ তথা আল্লাহর আইনপ্রতি...