শিক্ষা ও সাক্ষরতার হার : শিক্ষার বর্তমান অবস্থা পর্যালোচনা
৮ সেপ্টেম্বর পালিত হবে ‘সাক্ষরতা দিবস’। দিবসটিকে সামনে রেখে পাঠকের সামনে দেশের বর্তমান শিক্ষার অবস্থা নাতিদীর্ঘভাবে তুলে ধরার প্রয়াস পাচ্ছি। শিক্ষার হার ও সাক্ষরতার হার দুটো এক বিষয় নয়। আবার দুটিকে আলাদা ভাবে দেখারও সূযোগ নেই। কেননা, শিক্ষা ও সাক্ষরতার হারের মাধ্যমে প্রকাশ পাবে একটি দেশের শিক্ষা কতটুকু উন্নতি বা অবনতি করেছে। আর শিক্ষার এই উন্নতি ও অবনতিই বলে দেবে দেশ কতটুকু এগিয়েছে বা পিছিয়েছে।
’সাক্ষরতা’ কি ঃ সাধারণত ‘সাক্ষরতা’ বলতে অক্ষর জ্ঞানসম্পন্নতাকেই বুঝায়। তবে দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে এর পরিধি। এখন শুধু স্বাক্ষর জ্ঞান থাকলেই সাক্ষরতা বলা চলে না। বাংলাদেশের ভৌগলিক পরিসরে “সাক্ষরতা” শব্দের প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় ১৯০১ সালে লোক গণনা অফিসিয়াল ডকুমেন্টে। শুরুতে শুধু নিজের নাম লিখতে জানলেই তাকে স্বাক্ষর বলা হতো। ১৯৪০ সালে এসে সাক্ষরতার পরিধি বাড়িয়ে পড়ালেখার দক্ষতাকে সাক্ষরতা বলা হতো। ষাটের দশকে পড়া ও লেখার দক্ষতার সঙ্গে সহজ হিসাব-নিকাশের যোগ্যতাসম্পন্ন মানুষকে স্বাক্ষর মানুষ হিসেবে পরিগণিত হতো। আশির দশকে লেখাপড়া ও হিসাব-নিকাশের পাশাপাশি সচেতনতা ও দৃশ্যমান বস্তসামগ্রী পঠনের ক্ষমতা সাক্ষরতার দক্ষতা হিসেবে স্বীকৃত হয়। এখন এ সাক্ষরতার সাথে যোগাযোগের দক্ষতা, ক্ষমতায়নের দক্ষতা, জীবন নির্বাহী দক্ষতা, প্রতিরক্ষায় দক্ষতা এবং সাংগঠনিক দক্ষতাও সংযোজিত হয়েছে।
ইউনেস্কোর মতে, একজন সাক্ষরতাসম্পন্ন মানুষ লিখতে, পড়তে, হিসাব করতে এবং বুঝতে পারবেন। তাদের মতে এ চারটি মানদন্ডের ভিত্তিতে সাক্ষরতা নিরূপন করা হয়। এই সাক্ষরতা দিবসটি চালু করেছে ইউনেস্কো। ১৯৬৫ সালে ৮-৯ সেপ্টেম্বর ইরানের তেহরানে ইউনেস্কোর উদ্যোগে বিশ^ সাক্ষরতা সম্মেলন হয়। ওই সম্মেলনে প্রতিবছর ৮ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস পালনের প্রস্তাব করা হয়। পরে ১৯৬৫ সালে ১৭ নভেম্বর ইউনেস্কো ৮ সেপ্টেম্বরকে আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। সেই থেকে দিবসটি বাংলাদেশসহ পৃথিবীর সকল দেশ পালন করে আসছে।
ইউনেস্কো ও উইকিপিডিয়ার তথ্য মতে,বাংলাদেশের বর্তমান সাক্ষরতা হার ৪৭.৫০ ভাগ। বাংলাদেশ সরকারের হিসাব মতে, এ হার ৬২.৬৬ ভাগ। সাক্ষরতার হার বিবেচনায় বিশ^ র্যাংকিং এ বাংলাদেশের অবস্থান ১৬৪তম। প্রথমে রয়েছে জর্জিয়া। আমাদের পাশ^বর্তী দেশ ভারতের অবস্থান ১৪৭তম আর পাকিস্তানের অবস্থান ১৬০। এক্ষেত্রে এ দুই প্রতিবেশী দেশের চেয়েও আমরা পিছিয়ে আছি।
তবে সাক্ষরতার হার নিয়ে সরকার ও এনজিওগুলোর মধ্যে মতনৈক্য আছে। বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন কর্তাব্যক্তিরা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রকম তথ্য দিয়ে থাকে। ২০১৬সালের ০৮ সেপ্টেম্বর স্ক্ষারতা দিবসে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘সাক্ষরতা নিয়ে লেটেস্ট কোনো সার্ভে বা জরিপ নেই। তবে তিনি দাবি করে বলেন, যেহেতু আমার এলাকায় সাক্ষরতা হার একশভাগ, সেটা ধরেই বলতে পারি দেশে সাক্ষরতার হার ৭১ শতাংশ।’
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০১১ সালের সর্বশেষ তথ্য মতে, সাক্ষরতা হার ছিল ৫৮ ভাগ। আর সর্বশেষ বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থা গণসাক্ষরতার অভিযানে (ক্যাম্পে) দেশব্যাপী এক সমীক্ষায় দেখা যায়, সাক্ষরতার হার ৫১ দশমিক ৩০ শতাংশ। তন্মধ্যে পুরুষের হার ৫০ দশমিক ৫ ভাগ এবং নারী ৫৩ দশমিক ২ ভাগ। এ হিসেব মোতাবেক বলা যায়, দেশে এখনো ৪৮.৭০ শতাংশ মানুষ নিরক্ষর । তরুণদের মধ্যে এই নিরক্ষতার হার প্রায়ই ২৫ শতাংশ।
শিক্ষার হার ঃ প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সরকারের অতিরিক্ত সচিব মোঃ নুরুল আমিন সম্প্রতি নওঁগায় আয়োজিত এক সভায় বলেন, দেশে বর্তমানে শিক্ষার হার শতকরা ৭০ভাগ। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের শিক্ষার হার ছিল ১৬.৮ ভাগ। সে তুলনায় গত ৪৫ বছরে শিক্ষার হার বৃদ্ধি পেয়েছে ৫৩.২ ভাগ। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষার সর্বশেষ ২৮ জুন প্রকাশিত রিপোর্টে দেখা যায়, বাংলাদেশের বর্তমান শিক্ষার হার ৬২.৭ শতাংশ। সরকারী হিসেব (উপআনুষ্টিক শিক্ষা অধিদপ্তর) অনুযায়ী বিগত ৪৫ বছরে সামগ্রিক শিক্ষার হার ১৬.৮% থেকে বৃদ্ধি পেয়ে তা ৬৩% এ উন্নীত হয়েছে। ২০১৩ সালে নারী শিক্ষার ক্ষেত্রে এ হার ৭৮.৮৬%, যা পুরুষ শিক্ষার হার ৭৮.৬৭% থেকেও বেশি।
শিক্ষার বাজেট ও গুণগত মান ঃ শিক্ষা ও সাক্ষরতা হার বাড়লেও শিক্ষার গুণগত মান অর্জনে বাংলাদেশ এখনো পিছিয়ে রয়েছে এবং পরিতাপের বিষয় হলো শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়নে তেমন কোনো বলিষ্ঠ পদক্ষেপ অদ্যাবধি নেওয়া হয়নি। বাংলাদেশের শিক্ষা বাজেটের গতি প্রকৃতি লক্ষ্য করলেই তা সকলের কাছে ¯পষ্ট হয়ে যাবে। বিগত সাত বছরের শিক্ষা বাজেটে গড় বরাদ্দ ছিল মোট বাজেটের ১৩.৭%, যা ২০১০ সালে ছিল সর্বোচ্চ (১৬.৩%)। অন্যদিকে গত দুই দশকে জিডিপি’র মাত্র ২% শিক্ষা খাতে ব্যয় হয়েছে। অথচ ইউনেস্ক’র পরামর্শ অনুযায়ী শিক্ষা বাজেটে বরাদ্দ জাতীয় বাজেটের নূন্যতম ২০ শতাংশ হওয়া ব্যঞ্চনীয় এবং শিক্ষা খাতে ব্যয় মোট জিডিপি’র নূন্যতম ৬ শতাংশ হওয়া উচিত। যা ছাড়া শিক্ষার মানোন্নয়ন সম্ভব নয়।
শিক্ষা খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দের দাবিটিও বিবেচনার দাবি রাখে। এখানে একটি শুভঙ্করের ফাঁকি লক্ষ্য করা যায়। শিক্ষা বাজেটের সাথে প্রযুক্তি, খেলাধুলা, স্বাস্থ্য, ধর্মসহ নানাবিধ খাতকে জুড়ে দেয়া হয়। এমনকি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন বাজেটে সামরিক বাহিনী পরিচালিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহের বরাদ্দও ঢুকিয়ে দেয়া হয়। ফলে বরাদ্দকৃত স্বল্প অর্থটুকুও ভাগাভাগি হয়ে যায় অন্যান্য খাতের সাথে। ২০০৭-০৮ ও ২০১১-১৩ অর্থবছরে শিক্ষার সাথে প্রযুক্তি এবং ২০০৮-০৯ অর্থবছরে শিক্ষা ও প্রযুক্তির সাথে স্বাস্থ্য খাতকেও জুড়ে দেয়া হয়েছিল।
২০১০ সালে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দকৃত ৮৭১২ কোটি টাকার বাজেটের ৭৩৬০ কোটি টাকাই ব্যয় হয়েছে অনুন্নয়ন খাতে, অন্যদিকে উন্নয়ন খাতে ব্যয় হয়েছে ১৩৫২ কোটি টাকা। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে অনুন্নয়ন খাতে এ বরাদ্দ দাড়িয়েছে ১১৮৯৩ কোটি টাকা, অন্যদিকে উন্নয়ন খাতে এ বরাদ্দ দাড়িয়েছে ৩৬৪৭ কোটি টাকা। এতে করে শিক্ষার্থী প্রতি মাথাপিছু ব্যয় এসে দাড়ায় ১২০০ টাকারও নিচে (২০১২ সাল)। ২০১১ সালে শিক্ষার্থী প্রতি মাথাপিছু ব্যয় ছিল ১০০০ টাকারও নিচে। বরাদ্দের ক্ষেত্রে উন্নয়ন খাতকে ক্রমাগত উপেক্ষা করা শিক্ষার মানোন্নয়নের বড় ধরণের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। শিক্ষা অবকাঠামোর দেখভাল, শিক্ষার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় পাঠ্যপুস্তক, শিক্ষা-সহায়ক উপকরণ সরবরাহ ও সর্বোপরি শিক্ষাক্ষেত্রে নিয়োজিত শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন অনুন্নয়ন খাতের অংশ এবং এই ক্ষেত্রগুলোতে বরাদ্দ বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই।
মনে হয় আমরাই একমাত্র জাতি, যারা এ সহজ সূত্রটা বুঝিনা। যদি বুঝতাম তাহলে শিক্ষা নিয়ে এত টালবাহনা হতোনা। একটা শিক্ষানীতি তৈরী করতে আমাদের লেগেছে প্রায় ৪০ বছর। কিন্তু সেটা আজ অবধি বাস্তবতার মুখ দেখেনি। দিতে পারিনি শিক্ষকদের জন্য বেতন-ভাতা। দিতে পারিনি শিক্ষকদের যথাযথ মর্যাদা। তাইতো জাতি গড়ার কারিগররা আজ ক্লাস বন্ধ করে রাস্তায় নেমেছে পড়ে। এটা জাতি হিসেবে আমাদের জন্য কলঙ্কজনক। আজ প্রাইমারি থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সর্বত্র আন্দোলন চলছে মর্যাদা ও বেতন-ভাতার জন্য। কিন্তু সরকার তাদের কথায় কর্ণপাত করছে না। অথচ সরকারের উচিত ছিল শিক্ষকদের সাথে বসে আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টির সুরাহা করতে। তাদের ন্যায্য দাবি মেনে নিয়ে তাদের যথাযথ সম্মান দিতে। সেটা দিতে ব্যর্থ হলে যে দেশ এগুবে না সে কথা পূর্বেই বলা হয়েছে।
পরিশেষে, প্রতিবারের মতো এবারো ‘সাক্ষরতা দিবস’ পালন করবে সরকার। সরকারের বিভিন্ন কর্তাব্যক্তিরা হয়তো বুক ফুলিয়ে আঙুল উঁিচয়ে জোর গলায় বলবেনও, আমরা শিক্ষায় অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছি। সাক্ষরতার হার বাড়িয়ে কাল্পনিক এক তথ্যও দেয়া হবে। বাস্তবের সাথে হয়তো তার মিল পাওয়া দুষ্কর হবে। আমরা আশা করব, সরকার ভাগাড়াম্বর ছেড়ে বাস্তবিকভাবে শিক্ষা ও সাক্ষরতার হার শতভাগে উন্নীত করতে শিক্ষায় বাজেট বৃদ্দি করবেন। শিক্ষকদের মর্যাদা ফিরিয়ে দিবেন। তাহলে সম্ভব দেশকে উন্নত করা। কেননা, সাক্ষরতা একটি দেশের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সাক্ষরতার সাথে শিক্ষার আর শিক্ষার সাথে উন্নয়নের সম্পর্ক রয়েছে। যে দেশে সাক্ষরতার হার বেশী সে দেশ তত উন্নত।

No comments:
Post a Comment