শিক্ষায় দ্বৈতনীতি অগ্রহণযোগ্য
মুহাম্মদ জামাল উদ্দীন রব্বানি
চিরসত্য প্রবাদ ; শিক্ষায় জাতির মেরুদন্ড। মেরুদন্ড ছাড়া যেমন মানুষ চলতে পারেনা, তদ্রুপ শিক্ষা ছাড়া জাতি অচল। জাতিকে উন্নতির সুউচ্চ শিখরে পৌঁছাতে তাই শিক্ষা প্রসারের বিকল্প নাই। আর এ শিক্ষা প্রসারের কাজ কারো একার নয়। এর সাথে জড়িত সরকার, শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং জনগণ। ব্যক্তিকেন্দ্রিক শিক্ষার প্রসার ঘটে বটে, তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় নিতান্তই অপ্রতুল। শুধু শিক্ষা প্রসার ঘটালে তো হবেনা তার মানও থাকা চাই। যেনতেন শিক্ষা দিয়ে দেশ ও জাতির কল্যাণ সাধন আকাশ কুসুম কল্পনা। এখানে সরকার্রে ঐকান্তিক প্রচেষ্টার সাথে শিক্ষকদের সদিচ্ছা ও শিক্ষার্থীদের মনোযোগী হতে হবে। আর জনসাধারণের হতে হবে সচেতন।
কিন্তু বর্তমানে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা যেন রাজনীতির সস্তা জনপ্রিয়তা অর্জনের মতো। এখানে সরকার শিক্ষাব্যবস্থায় উন্নতি চায় বটে, তবে তা ‘তেল ছাড়া মচমচে’ খাওয়ার মতো। দেশ স্বাধীনের ৪০ বছর পর বাম-ডানের ঘঁষাঘঁিষ করে অনেক চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে ২০১০ সালে একটি শিক্ষানীতি প্রণয়ন করেছে। তা বাস্তবায়নের প্রক্রিয়াও চলছে। কিন্তু তাতে সরকারের বড় ধরনের গলদ রয়েছে। কারণ সরকার শিক্ষানীতি বাস্তবায়ন করতে চায় কিন্তু বাস্তবায়নকারীদের ন্যায্য দাবী পূরণ করতে চায়না। দেশে সরকারী - বেসরকারী দু’ধরনের শিক্ষাব্যবস্থায় বিস্তর ফারাক রেখে আদৌ শিক্ষানীতি বাস্তবায়ন করতে পারবে কিনা সন্দেহ। এক দেশে দুইনীতি গ্রহনযোগ্য নয়। শিক্ষার মতো গুরুত্বপুর্ণ জায়গায় যদি সরকার ইনভেস্ট করতে না পারে তবে অন্য জায়গাগুলোতে ইনভেস্ট বা গুরুত্ব দেয়া হাস্যকর। অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়া সুচ খুজঁতে আলোর দরকার হয়। আর সে আলো যদি মিটিমিটি জ্বলে, তা দিয়ে কাজ হয়না। ফকফকে আলোর দরকার হয়। সরকার শিক্ষা খাতের এক বড় অংশকে বেসরকারী করে রেখে অন্ধকারে মিটিমিটি আলো দিয়ে সুচ খুঁজতে চেষ্টা করছে।
শিক্ষা গবেষক ড. সিদ্দিকুর রহমান “শিক্ষার মান বাড়াতে হলে” শিরোনামে একটি নিবন্ধে লিখেছেন- ‘শিক্ষার মান বাড়াতে হলে শিক্ষকদের মান বাড়াতে হবে। মেধাবী শিক্ষক ছাড়া শ্ক্ষিার মান বৃদ্ধি সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে মেধাবীদের শিক্ষকতা পেশায় আনতে হলে অবশ্যই তাদের ভালো বেতন-ভাতা দিতে হবে।” তিনি তাঁর অভিজ্ঞতা বর্ণনাপূর্বক লিখেন, “পাশ্ববর্তী দেশ ভারতেও শিক্ষকদের বেতন-ভাতা সম্মানজনক। আর চীনেও যে উচ্চ বেতন-ভাতা দেয়া হয়, তাতে সেদেশের শিক্ষকরা সন্তুষ্ট।”
কিন্তু দূর্ভাগ্যের বিষয় হলো, আমাদের সরকারের নীতিনির্ধারকরা তা বুঝেও না বোঝার ভান করছেন। বর্তমান সরকার ২০০৮ সালের নির্বাচনী ইশতিহারে শিক্ষকদের জন্য আলাদা বেতন-ভাতা কাঠামো গঠন করার ঘোষনা দিয়েছিল। কিন্তু সেই সরকারের মেয়াদ শেষ করে পুণরায় ক্ষমতা দখল করার পরও তা বাস্তবায়ন করেনি। অথচ সরকার শিক্ষা খাতে ব্যাপক সাফল্যের কথা প্রচার করে আসছে। সাফল্য যে একেবারে নেই তা বলবনা। তবে সেটা ঐ মিটিমিটি আলো দিয়ে নিকষ কালো অন্ধকারে সুচ খোঁজার মতো।
গত বছর সরকার দেশের ২৬ হাজার ২০০ বেসরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ১লাখ ৪ হাজার শিক্ষকের চাকুরী জাতীয়করণ করেছে। তবে এজন্য অনেক আন্দোলন-সংগ্রাম করতে হয়েছে প্রাথমিক শিক্ষকদের। এমনকি তার জন্য একজন শিক্ষককে প্রাণ বিসর্জন দিতেও হয়েছে। কিন্তু এখনো অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা বেতন-ভাতা উত্তোলন করতে পারেনি। অন্যদিকে এমপিওভূক্ত বেসরকারী স্কুল, কলেজ শিক্ষক-কর্মচারী প্রায় সব সংগঠনগুলো তাদের চাকুরী জাতীয়করণসহ বিভিন্ন দাবীতে আন্দোলন করছে। বিশেষ করে সামনের জুলাইয়ে ঘোষিত হতে যাওয়া নতুন পে-স্কেলে শিক্ষকদের বেতন বৃদ্ধির বিষয়টি সরকার নিশ্চিত না করায় শিক্ষকদের মধ্যে একটা চাপা ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। তারা যেকোন কঠিন আন্দোলনে নামতে পারে যেকোন সময়। একদিকে সরকার কিছু প্রাথমিক বিদ্যালয়কে জাতীয়করণ করল অন্যদিকে শতকরা ৮০ভাগ বেসরকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের লক্ষ লক্ষ শিক্ষকের ন্যায্য দাবী, সময়ের গুরুত্বপূর্ণ দাবীকে পুলিশের লাঠি দিয়ে গুড়িয়ে দিল। এ চরম বৈষম্য ও দ্বৈতনীতি সত্যিই ন্যাক্কারজনক।
বছরের প্রথমদিন শিক্ষার্থীদের হাতে বই তুলে দিয়ে আর পরীক্ষার খাতায় ভুলের মধ্যেও জোরপূর্বক নাম্বার দিয়ে পাশের হার বাড়িয়ে শিক্ষার ক্ষেত্রে সস্তা জনপ্রিয়তা হাসিল করা যায়, জনগণকে ধোঁকা দেয়া যায়। কিন্তু আসল কর্ম সাধিত হয়না। হাজার হাজার এ প্লাস অথচ ভর্তির জন্য কলেজে সীট নাই। ভুরিভুরি পাশ অথচ ততটুকু মান নাই। অথচ সরকারের হাক ডাকের শেষ নাই। এই শিক্ষা দিয়ে কী হবে !
শিক্ষাকে কলুষমুক্ত করতে বিদ্যালয়ে কোচিং / প্রাইভেট বন্ধ করল, অথচ বাজারে বাজারে নিম্নমানের অদক্ষ শিক্ষকের চটকদারী সাইনবোর্ডে কোচিং বাণিজ্য ঠিকই চলছে। আর এ কোচিং বাণিজ্যের সাথে সবচেয়ে বেশী জড়িত সরকারের চোখের বিষ জামায়াত-শিবিরের কর্মীরা। সরকার একদিকে যুদ্ধপরাধী জামায়াত শিবির দমন করছে আর অন্য দিকে আসল শিক্ষকদের বঞ্চিত করে জামায়াত শিবির পরিচালিত কোচিং সেন্টারগুলোকে বাণিজ্য করার সুযোগ দিচ্ছে। এমন দ্বৈতনীতি বড়ই স্যেকুলার।
শিক্ষার ক্ষেত্রে দ্বৈতনীতির ফলে কত বড়রকমের বৈষম্য সৃষ্টি হয়েছ তা বুঝতে বড় কোন বুদ্ধিজীবি হওয়ার প্রয়োজন নেই। নিচের পার্থক্যটি পড়লে বুঝতে পারবেন।
একজন বেসরকারী স্কুল শিক্ষক এবং একজন সরকারী স্কুল শিক্ষক একই সময়ে একই স্কেলে শিক্ষকতা পেশায় যোগদান করে কয়েক বছর চাকুরী করার পর দেখা যায় সরকারী স্কুল শিক্ষকটি বেসরকারী স্কুল শিক্ষকের তুলনায় ৩ থেকে ৪ গুণ বেশী বেতন-ভাতা পাচ্ছেন। বেসরকরী স্কুল শিক্ষকটি যেই তিমিরে ঢুকেছিল সেই তিমিরে থেকে যায়। দু‘একটি তথ্য দিলেই এ বৈষম্যটা আরো স্পষ্ট হবে। একজন সরকারী শিক্ষক বছর বছর ইনক্রিমেন্ট পান কিন্তু একজন বেসরকারী শিক্ষক পান সারা জীবনে একবার। অথচ দুজনের কর্মদায়িত্ব এক। বেসরকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পিয়ন থেকে অধ্যক্ষ পর্যন্ত সারাজীবনে নির্ধারিত বাড়ী ভাড়া মাত্র ৫০০ টাকা। কী লজ্জাজনক ! অথচ সরকারী শিক্ষকদের মূল বেতনের ৪০% বাড়ী ভাড়া দেয়া হয়। বেসরকারী শিক্ষকরা চিকিৎসা ভাতা পান মাসে মাত্র ৩৫০টাকা। আচ্ছা বলুন তো এই টাকা দিয়ে ডাক্তার কেন একজন কবিরাজ দেখানোও সম্ভব কিনা। এভাবে হিসাব দিলে বৈষম্যের ফারাক শুধু দীর্ঘায়িত হবে।
আসলে সরকারের এ অবস্থা দেখে আমার বাড়ীর পাশে এক ভদ্রলোকের কথা বারবার মনে পড়ে। তিনি ধান কাটা ও রোপনের সময় বাজার থেকে কামলা এনে দিনের পর দিন বিরতীহীন কাজ করাতেন। আর যাওয়ার সময় হলে মাইনে দিতেন বাজারমূল্যের অর্ধেক । কাজে গন্ডগোল হলে পিটাও দিতেন আর মাইনে কম হওয়ার কথা বললে মাইনে ছাড়াই তাড়িয়ে দিতেন। এখন আমাদের সরকারের অবস্থাও প্রায় এই রকম। শুধু এ সরকার কেন, সবার অবস্থা ‘যে যায় লঙ্কায়, সে হয় রাবণ’।
সবশেষে বলব, দেশের শতকরা ৮০ভাগ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে বেসরকারী খাতে রেখে, শিক্ষক সমাজের মধ্যে মর্যাদা ও বেতন-ভাতার বৈষম্য বাড়িয়ে, দ্বৈতনীতির শিক্ষাব্যবস্থা জাতির কাঙ্খিত ফল দেবেনা। শিক্ষা একটি মৌলিক অধিকার। এ অধিকার প্রতিষ্ঠায় শিক্ষাকে জাতীয়করণ শুধু সময়ের দাবী নয় বরং এটা জাতির প্রধান অধিকার। এ অধিকার সরকারকেই বাস্তবায়ন করতে হবে। সরকারের শুভ বুদ্ধির উদয় হোক।

No comments:
Post a Comment