Wednesday, 31 July 2019

প্রবন্ধঃ অন্ধকার গলিতে দেশের শিক্ষা

অন্ধকার গলিতে দেশের শিক্ষা
মুহাম্মদ জামাল উদ্দীন রব্বানী

গবেষণা সংস্থা বিআইডিএস এর সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ড. নাজনীন আহমেদ মনে করেন ‘শিক্ষার বর্তমান মান প্রশ্নবিদ্ধ।’ ড. নাজনীনের এ মন্তব্যের সাথে সচেতন আম জনতার প্রায় সবাই একমত। হয়তো যারা বর্তমান সরকারের আজ্ঞাবহ বা সমর্থক তারা এর বিরোধীতা করতে পারেন। কিন্তু সত্যিই যদি আজ শিক্ষা বা শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে দৃষ্টি নিরপেক্ষ কোণ থেকে আলোচনা করা হয় এ কথা না মেনে উপায় নেই যে, দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা অজানা এক অন্ধকার গলিতে ঘুরপাক খাচ্ছে।
এ যেমন ধরুন, যুক্তরাজ্যের লন্ডন ভিত্তিক সাপ্তাহিক টাইম্স হায়ার এডুকেশন (টিএইচই) শিক্ষার মান গবেষণাসহ বিভিন্ন মানদন্ডে ২০১৫ সালে এশিয়ার যে ১০০টি মর্যাদাপূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকা প্রকাশ করেছে, তার কোথাও বাংলাদেশের নাম নেই। তার মানে কি দাড়াঁচ্ছে, আমাদের দেশের উচ্চ শিক্ষার মান অন্যান্য দেশের চেয়ে পিছিয়ে। অথচ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড বলা হয়ে থাকে। কিন্তু সেটিও তার মান ও সুনাম ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। আর দেশের অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কথা কী বলব। অথচ এ তালিকায় জাপান ও চীনের প্রাধান্য রয়েছে।এমনকি পাকিস্তানের বিশ্ববিদ্যালয়ও স্থান পেয়েছে। মান থাকবে কোত্থেকে, প্রশাসন থেকে শুরু করে শিক্ষক পর্যন্ত সব যদি দলীয়করণ করা হয়? এখানে মেধাবীদের স্থান কোথায়? বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের গবেষণাখাতে যথেষ্ট বরাদ্দ নেই। আবার যা আছে তা দিয়ে শিক্ষকরাও বিদেশ ভ্রমন করেন। ক্লাস করেন না নিয়মিত। শহীদ হালিম লিয়াকত স্মৃতি বৃত্তি পরীক্ষার এক পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষক (নাম অনুল্লেখ্য) গর্ব করে বলেছেন, ‘তিনি ৪টি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ান’। একজন শিক্ষক যদি একসাথে ৪টি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ান তাহলে প্রশ্ন থেকে যায়, তিনি তার বিশ্ববিদ্যালয়ে কয়টা ক্লাস নেন? বা আদৌ তিনি নিয়মিত ক্লাস নেন কিনা। এ রকম অবস্থা দেশের প্রায় সব বিশ্ববিদ্যালয়ে। তবে একটা বাস্তব কথা, মেধাবী শিক্ষকদের শিক্ষকতা পেশায় আনতে হলে তাদের ভালো সম্মানী ও মর্যাদা দিতে হবে। যা দিতে সরকার ব্যর্থ হয়েছে। যার ফলশ্রুতিতে দেশের সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা ক্লাস বন্ধ করে একযোগে আন্দোলনে নেমেছে। কিন্তু সরকার তাতে মাথা ঘামাচ্ছেনা। অধিকন্তু সরকারের অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত শিক্ষকদের জ্ঞানের অভাব আছে বলে মন্তব্য করেন। অর্থমন্ত্রী মহোদয়ের এ মন্তব্য যদিও পরের দিন প্রত্যাহার করে নিয়েছেন তবুও একটা প্রশ্ন থেকে যায়, সরকার যদি জানে যে, সত্যিই শিক্ষকদের জ্ঞানের অভাব আছে, তাহলে তারা জ্ঞানী তথা মেধাবীদের শিক্ষকতা পেশায় আনার চেষ্টা করছেন না কেন? কেননা তারা জানে, শিক্ষকদের যে বেতন ও মর্যদা দেয়া হচ্ছে তাতে মেধাবীরা এ পেশায় আসবে না। শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ে নয়, দেশের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্কুল-কলেজগুলোতেও একই সমস্যা। ইউরোপে সহযোগিতা এবং উন্নয়ন সংস্থা ওইসিডি বলছে, ৭৬ টি দেশের স্কুলগুলোর ফলাফলের ভিত্তিতে উন্নতমানের শিক্ষায় সিঙ্গাপুর শীর্ষে। এখানেও বাংলাদেশের অবস্থান নেই। এর চেয়েও ভয়াবহ তথ্যা রয়েছে প্রাথমিক শিক্ষায়। শিক্ষা নিয়ে আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা রুম টু রিড বাংলাদেশ এর গবেষণা প্রতিবেদনে জানিয়েছেন- বাংলাদেশে প্রথম শ্রেণী উত্তীর্ণ শিশু শিক্ষার্থীদের প্রায় ৩২ শতাংশই বাংলা একটি শব্দও উচ্চারণ করে পড়তে পারেনা! আর দ্বিতীয় শ্রেণী উত্তীর্ণদের প্রায় ১৬ শতাংশই বাংলা একটি শব্দও উচ্চারণ করে পড়তে সক্ষম নয়! এ যদি হয় আমাদের শিক্ষার্থীদের অবস্থা তাহলে স্বভাবতই প্রশ্নবিদ্ধ শিক্ষার মান।
সম্প্রতি বিবিসি বাংলার সংলাপে একজন দর্শক বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী জনাব শাহরিয়ার আলমের কাছে এক প্রশ্ন করেন,“ বাংলাদেশে শিক্ষার স্তরগুলোতে যে মান রয়েছে তা ভবিষ্যতে দেশের জনগোষ্ঠিকে দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করতে কি যথেষ্ট ভূমিকা রাখতে পারবে ?” তাঁর উত্তরে তিনিও স্বীকার করে নিয়েছেন যে শিক্ষার বর্তমান মান ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের জন্যে যথেষ্ট নয়। তবে সরকার নানা পদক্ষেপ নিচ্ছে এ পরিস্থিতির উত্তরণ ঘটাতে।
একই অনুষ্টানে অংশ গ্রহণ করে ড. আসাদুজ্জামান রিপন বলেন, দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা খুবই নাজুক পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে। এর জন্য শিক্ষকদের অবমূল্যায়নকে দায়ী করেন তিনি। তিনি বলেন, যদি শিক্ষকদের আকর্ষণীয় বেতন-ভাতা দেয়া যেত তাহলে মেধাবীরা এ পেশায় আসত এবং শিক্ষার মান বাড়ত।
মোদ্দাকথা, শিক্ষার সর্বোচ্চ অঙ্গন থেকে প্রাথমিক লেভেল পর্যন্ত সবখানে শিক্ষার মান নিম্মগামী। এ পশ্চাতপদতা জাতির জন্য কলঙ্কজনক। এটা জাতির উন্নতির পথে অন্তরায়। শিক্ষার উন্নতির সাথে অর্থনৈতিক উন্নতি জড়িত। এটা সিঙ্গাপুরের দিকে দেখলে স্পষ্ট বুঝা যায়। ১৯৬০ সালেও তারা অর্থনৈতিক দিক দিয়ে অনেক পিছিয়ে ছিল।
শিক্ষায় উন্নতির সাথে সাথে তাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও বাড়তে থাকে।
ওইসিডি-র রিপোর্টে বলা হয়েছে, কোন দেশের শিক্ষার গুণগত মানই বলে দেবে সে দেশ অর্থনৈতিক দিক থেকে কতটুকু সফল হবে। দুর্বল শিক্ষা নীতি এবং ব্যবস্থার ফলে অনেক দেশের অর্থনীতি এক ধরনের স্থায়ী মন্দার মধ্যে
আটকে থাকে । শিক্ষা ব্যবস্থা উন্নত করলে অসাধারণ দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক সাফল্য আসবে।
সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক উন্নয়নের মাধ্যমে সমাজে মৌলিক পরিবর্তন আনার ক্ষেত্রে শিক্ষায় মূল ভূমিকা পালন করে থাকে। সরকারী হিসেব (উপআনুষ্টিক শিক্ষা অধিদপ্তর) অনুযায়ী বিগত ৪৫ বছরে সামগ্রিক শিক্ষার হার ১৬.৮% থেকে বৃদ্ধি পেয়ে তা ৬৩% এ উন্নীত হয়েছে। ২০১৩ সালে নারী শিক্ষার ক্ষেত্রে এ হার ৭৮.৮৬%, যা পুরুষ শিক্ষার হার ৭৮.৬৭% থেকেও বেশি।
কিন্তু শিক্ষা ক্ষেত্রে বাংলাদেশের এ সাফল্য ইতিবাচক হলেও শিক্ষার গুণগত মান অর্জনে বাংলাদেশ এখনো পিছিয়ে রয়েছে এবং পরিতাপের বিষয় হলো শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়নে তেমন কোনো বলিষ্ঠ পদক্ষেপ অদ্যবধি নেওয়া হয়নি। বাংলাদেশের শিক্ষা বাজেটের গতি প্রকৃতি লক্ষ্য করলেই তা সকলের কাছে ¯পষ্ট হয়ে যাবে। বিগত সাত বছরের শিক্ষা বাজেটে গড় বরাদ্দ ছিল মোট বাজেটের ১৩.৭%, যা ২০১০ সালে ছিল সর্বোচ্চ (১৬.৩%)। অন্যদিকে গত দুই দশকে জিডিপি’র মাত্র ২% শিক্ষা খাতে ব্যয় হয়েছে। অথচ ইউনেস্ক’র পরামর্শ অনুযায়ী শিক্ষা বাজেটে বরাদ্দ জাতীয় বাজেটের নূন্যতম ২০ শতাংশ হওয়া ব্যঞ্চনীয় এবং শিক্ষা খাতে ব্যয় মোট জিডিপি’র নূন্যতম ৬ শতাংশ হওয়া উচিত।
শিক্ষা খাতে সর্বোচ্চ বারাদ্দের দাবিটিও বিবেচনার দাবি রাখে। এখানে একটি শুভঙ্করের ফাঁকি লক্ষ্য করা যায়। শিক্ষা বাজেটের সাথে প্রযুক্তি, খেলাধুলা, স্বাস্থ্য, ধর্মসহ নানাবিধ খাতকে জুড়ে দেয়া হয়। এমনটি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন বাজেটে সামরিক বাহিনী পরিচালিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহের বরাদ্দও ঢুকিয়ে দেয়া হয়। ফলে বরাদ্দকৃত স্বল্প অর্থটুকুও ভাগাভাগি হয়ে যায় অন্যান্য খাতের সাথে। ২০০৭-০৮ ও ২০১১-১৩ অর্থবছরে শিক্ষার সাথে প্রযুক্তি এবং ২০০৮-০৯ অর্থবছরে শিক্ষা ও প্রযুক্তির সাথে স্বাস্থ্য খাতকেও জুড়ে দেয়া হয়েছিল।
২০১০ সালে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দকৃত ৮৭১২ কোটি টাকার বাজেটের ৭৩৬০ কোটি টাকাই ব্যয় হয়েছে অনুন্নয়ন খাতে, অন্যদিকে উন্নয়ন খাতে ব্যয় হয়েছে ১৩৫২ কোটি টাকা। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে অনুন্নয়ন খাতে এ বরাদ্দ দাড়িয়েছে ১১৮৯৩ কোটি টাকা, অন্যদিকে উন্নয়ন খাতে এ বরাদ্দ দাড়িয়েছে ৩৬৪৭ কোটি টাকা। এতে করে শিক্ষার্থী প্রতি মাথাপিছু ব্যয় এসে দাড়ায় ১২০০ টাকারও নিচে (২০১২ সাল)। ২০১১ সালে শিক্ষার্থী প্রতি মাথাপিছু ব্যয় ছিল ১০০০ টাকারও নিচে। বরাদ্দের ক্ষেত্রে উন্নয়ন খাতকে ক্রমাগত উপেক্ষা করা শিক্ষার মানোন্নয়নের বড় ধরণের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। শিক্ষা অবকাঠামোর দেখভাল, শিক্ষার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় পাঠ্যপুস্তক, শিক্ষা-সহায়ক উপকরণ সরবরাহ ও সর্বোপরি শিক্ষাক্ষেত্রে নিয়োজিত শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন অনুন্নয়ন খাতের অংশ এবং এই ক্ষেত্রগুলোতে বরাদ্দ বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই।
মনে হয় আমরাই একমাত্র জাতি যারা এ সহজ সূত্রটা বুঝিনা। যদি বুঝতাম তাহলে শিক্ষা নিয়ে এত টালবাহনা হতনা। একটা শিক্ষানীতি তৈরী করতে আমাদের লেগেছে প্রায় ৪০ বছর। কিন্তু সেটা আজ অবধি বাস্তবায়ন করতে পারিনি। দিতে পারিনি শিক্ষকদের জন্য বেতন-ভাতা। দিতে পারিনি শিক্ষকদের যথাযথ মর্যাদা। তাইতো জাতি গড়ার কারিগররা আজ ক্লাস বন্ধ করে রাস্তায় নেমেছে পড়ে। এটা জাতি হিসেবে আমাদের জন্য কলঙ্কজনক। আজ প্রাইমারি থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সর্বত্র আন্দোলন চলছে মর্যাদা ও বেতন-ভাতার জন্য। কিন্তু সরকার তাদের কথায় কর্ণপাত করছে না। অথচ সরকারের উচিত ছিল শিক্ষকদের সাথে বসে আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টির সুরাহা করতে। তাদের ন্যায্য দাবি মেনে নিয়ে তাদের যথাযথ সম্মান দিতে। সেটা দিতে ব্যর্থ হলে যে দেশ এগুবে না সে কথা পূর্বেই বলা হয়েছে।
শিক্ষকদের আন্দোলনে ক্লাস না হওয়া, সরকারী অবহলোয় শিক্ষা ব্যবস্থায় দূরাবস্থা সব মিলিয়ে শিক্ষা ও শিক্ষা ব্যবস্থা এক অন্ধকার গলিতে ঘুরপাক খাচ্ছে। তলিয়ে যাচ্ছে জাতির উন্নতির সুন্দর রাস্তা।এটা হতে দেয়া যায়না। এভাবে চলতে পারেনা দেশের শিক্ষা ব্যস্থা। অন্তত এবারের বাজেটে শিক্ষাখাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি করে সরকার যেন শুভবুদ্ধির পরিচয় দেয় এ প্রত্যাশা করছি।


No comments:

Post a Comment

ইসলামে রাজনীতি ও তাকওয়া

 ভূমিকা ইসলামে রাজনীতি ও রাজনীতিতে তাকওয়া বর্তমান প্রেক্ষাপটে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। বর্তমান দুনিয়ায় ‘ইকামতে দীন’ তথা আল্লাহর আইনপ্রতি...