মুহাম্মদ জামাল উদ্দীন রব্বানি
কিছু দিন পূর্বে আমি একটি ছড়া লিখেছিলাম। সে ছড়াটির শেষ ক’টি পংতির একটি লাইন আজকের শিরোনাম। লিখেছিলাম-
দেশ তো এখন দেশ নাই
খেল্ তামসার শেষ নাই
আরো কত দূর্নীতি,
ভাই দিয়ে ভাই মারে
পরে মায়া কান্না করে
এটাই কি রাজনীতি ?
সত্যিই আজ অপরাজনীতির যাঁতাকলে পিষ্ট দেশের মানুষ। আজ মহাজোট চেটেপুটে খাচ্ছে তো, কাল বিশ দলীয় জোট। দেশটা যেন তাদের বাপের/স্বামীর সম্পত্তি। প্রায়শ: তারা কী চমৎকার বুলিইনা আওড়ায়- “দেশটা কি এ জন্য স্বাধীন করেছিলাম?” কেন স্বাধীন করেছিল তা আসকের (আইন ও সালিশ কেন্দ্র) একটি প্রতিবেদন থেকেই বুঝা যায়। সর্বশেষ দেয়া আসকের এ প্রতিবেদনে “দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি খুবই উদ্বেগজনক” উল্লেখ করে বলা হয়েছে, ২০১৪ সালে বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ড ঘটেছে ১২৮টি। গুপ্তহত্যা ও গুম হয়েছে ৮৮টি। সহিংসতায় নিহত হয়েছে ১৪৭জন। আর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নির্যাতনে মারা গেছে ১৩জন। আঁৎকে উঠার মতো এ তথ্যও তাদের অন্তরে কাঁপন ধরাতে পারেনি। তার মানে ক্ষমতায় টিকে থাকতে বা দখলে নিতে এটা আর এমন কী অপরাধ‼ এ তো মামুলি বিষয়।
বিতর্কিত নির্বাচন দিয়ে বছর শুরু ঃ
বিদায়ী ২০১৪ সালের শুরুতে ৫ জানুয়ারী একতরফা নির্বাচনে ১৪দলীয় মহাজোট সরকার পূণ:ক্ষমতা দখল করে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে দলীয় বাহিনী বানিয়ে, ছাত্রলীগ-যুবলীগকে লাটিয়াল বাহিনী বানিয়ে আওয়ামী সরকার ক্ষমতা দখলে রেখেছে। এ ক্ষমতা দখলের লড়াইয়ে শুধু নির্বাচনের দিনেই সহিংসতায় নিহত হয়েছে ১২জন। নির্বাচনকে ঘিরে ৬৬৪টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এতে নিহত হয়েছে ১৪৭ জন। আহত হয়েছে ৮হাজার ৩৭৩জন। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিই বলে দেয়, তারা কত জোর করে ক্ষমতা দখল করেছে। বলতে গেলে সাধারণ মানুষের রক্তের উপর পা দিয়ে তারা ক্ষমতায় বসেছে।
আলোচিত সাত খুন ঃ
এ সরকারের আমলে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ছিল নারায়নগঞ্জের প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলামসহ ৭জনকে অপহরণ করে পরবর্তীতে খুন করে লাশ শীতলক্ষ্যা নদীতে ফেলে দেয়া। এ ঘটনার সাথে র্যাবের বেশ কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার সরাসরি সংশ্লিতা প্রমাণিত হয়। শুধু এ ঘটনার দ্বারা বুঝা যায়, সরকার ক্ষমতায় টিকে থাকতে র্যাব-পুলিশকে কী ন্যাক্কারজনকভাবে ব্যবহার করছে।
আল্লাম ফারুকী (র:) হত্যা ঃ
নারায়নগঞ্জের এ ঘটনা যতটা না মানুষের বিবেককে নাড়া দিয়েছে, তার চেয়ে বেশী নাড়া দিয়েছে আল্লামা নুরুল ইসলাম ফারুকী হত্যা। গত আগষ্টের ২৭ তারিখ রাত নয়টার সময় ঢাকার রাজাবাজারে নিজ বাসায় অত্যন্ত নির্মমভাবে খুন হন দেশের প্রথিতযশা স্বনামধন্য এ আলেম। বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট ও আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা’তের প্রেসিডিয়াম সদস্য, বিশিষ্ট মিডিয়া ব্যক্তিত্ব, জনপ্রিয় ইসলামী অনুষ্টান উপস্থাপক শায়খ আল্লামা নুরুল ইসলাম ফারুকী (র:) কে যে নিখুঁত পরিকল্পনায় অত্যন্ত নৃশংসভাবে খুন করা হয় তাতেই প্রতিভাত হয় দেশের আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির কতটুকু অবণতি হয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা, এ সরকার কথায় কথায় বলে তারা জঙ্গীবাদের বিরোদ্ধে খুবই তৎপর। জঙ্গীবাদকে তারা প্রশ্রয় দেয়না। কিন্তু ভ্রান্ত জঙ্গীবাদীদের বিরোদ্ধে আপোষহীন লড়াকু সৈনিক আল্লামা ফারুকী (র)কে এ জঙ্গীবাদীরা হত্যা করেছে জেনেও তার আজ নির্বিকার। অবস্থা দৃষ্টে মনে হচ্ছে সরকার জঙ্গীদের সাথে আঁতাত করেছে। নয়তো কেন এরকম জঘন্য হত্যাকান্ডের ঘটনাকে সাধারণ ডাকাতির মামলা বলে চালিয়ে দিতে চায়। এখন মামলাটি ডিবিতে হস্তান্তর করলেও দুই দুইবার আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করতে ব্যর্থ হয়। এ মামলায় প্রথমে এক মহিলাসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করলেও তাদের জামিনে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। আর সবচেয়ে বেশী সন্দেহের তীর যে জঙ্গীবাদের দিকে, সে জঙ্গীবাদের মূল হোতা পিস টিভি বাংলাদেশের কথিত উপস্থাপক মুজাফ্ফর বিন মহসিনকে গ্রেপ্তার পরবর্তী ৫দিনের রিমান্ডে নিলেও তার কোন তথ্য মামলার বাদীদের অবগত করেনি। আর তাকে জামিন অযোগ্য জেল হাজতে আটকে রাখা হয়েছে। এর দ্বারা কি অনুমান করা যায় না, জঙ্গী সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়ায় সরকার নিজেদের স্বার্থে তাদের সাথে আঁতাত করে তাদের বিরোদ্ধে কোন ব্যবস্থা নিচ্ছেনা? বা ফারুকী হত্যার বিচার করছেনা ?
কিন্তু সরকারের ভুলে গেলে চলবেনা, ফারুকী হত্যার পর বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রসেনা সুন্নী জনতাকে সাথে যে তীব্র আন্দোলন গড়ে তুলেছিল তার চেয়েও ভয়াবহ আন্দোলন তাদের জন্য অপেক্ষা করছে। মাত্র অর্ধ দিবসের হরতালে যারা কোন প্রকার জ্বালাও পোড়াও বা ভয়ভীতি দেখানো ছাড়া সারা দেশ অচল করে দিতে পারে, অফিস-আদালত, রিক্সা-সাইকেলের চাকা পর্যন্ত বন্ধ করে দিতে পারে, তারা যদি লাগাতর আন্দোলনে নামে তাহলে সরকার তখ্ত ছেড়ে পালানোর পথও খুঁজে পাবেনা। সুতরাং সময় থাকতে যেন সরকারের শুভবোধের উদয় হয়। ফারুকী হত্যার বিচারের নামে যেন কোন প্রহসন সুন্নী জনতার সাথে না করে।
প্রশ্নপত্র ফাঁস ও ক্যাম্পাস সন্ত্রাস ঃ
এ সরকারের আরেক লজ্জাজনক অপকর্ম হলো পাবলিক পরীক্ষা প্রশ্নপত্র ফাঁস আর বছরজুড়ে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ-ছাত্রশিবিরের ত্রাসের রাজত্ব কায়েম। বিগত বছরের পিএসসি পরীক্ষা থেকে শুরু করে প্রায় প্রত্যেকটি পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র পরীক্ষার কয়েকদিন পূর্বেই ফাঁস হয়ে যায়। অথচ সরকার বা সরকারের মন্ত্রীরা তার কোন প্রতিকার করতে পারলো বরং উল্টো তারা নানান ধরনের সাফাই গেয়ে দায়িত্ব সেরেছে। তারা প্রচার করছে, এ সরকারই নাকি শিক্ষা ব্যবস্থার বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধন করেছে। তাইতো ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষাগুলোতে ইন্টারমিডিয়েটে গোল্ডেন এ প্লাস পাওয়া শিক্ষার্থীরা ‘গোল্ডেন ডাক’ মারেন। এতে শিক্ষার্থীর কোন দোষ নেই। তবে গলদ হচ্ছে গোড়াতে। সরকারের সফলতা দেখাতে শিক্ষা বোর্ডগুলোকে যদি পাশের হার বাড়ানোর জোর তাগিদ দেয়া হয়, সেই পাশের গোল্ডেন এ প্লাসগুলো তো গোল্ডেন জিরোই পাবেন।
আর তাদের ছাত্রসংগঠনের ‘সোনার ছাত্রলীগার’দের টেন্ডারবাজীর সাথে খুনাখুনিতেও কম যান না। সাথে ছাত্রশিবিরের পেশাদার সন্ত্রাসীরা তো আগে থেকেই এ্যকশনে ছিলো। শিক্ষক বাসে হামলা, শিক্ষক-ছাত্র হত্যা, প্রক্টর-শিক্ষককে মারধর-অবরোধ, বোমাবাজী, টেন্ডারবাজী বছরজুড়েই ছিল অপ্রতিরুদ্ধ। সরকারের সোনার ছেলেদের এই যদি হয় অবস্থা, শিক্ষাঙ্গন কেন, পুরো দেশই তো রসাতলে যেতে সময় লাগবেনা।
জিয়াদের গর্তে পড়া, যেন দেশটা গর্তে পড়েছে ঃ
শেষ করতে চাই সরকারের প্রযুক্তির অগ্রগতির খবর দিয়ে। ডিজিটাল বাংলাদেশ! ডিজিটাল বাংলাদেশ! বলে চিল্লাতে চিল্লাতে এ সরকার গলার পানি প্রায়ই শুকিয়ে ফেলেছে। প্রযুক্তিতে কত উন্নতি অগ্রগতি ‼ ৪ বছরের শিশুবাচ্চা জিয়াদ যখন খোদ রাজধানীতে ওয়াসার গভীর নলকূপের পাইপে পড়ে যায় তাকে উদ্ধার করতে গিয়ে বুঝা যায় সরকার ও সরকারী বাহিনীর প্রযুক্তির উন্নতি অগ্রগতি কতটুকু।সরকারের উন্নত প্রযুুক্তি এবং দক্ষ উদ্ধারকারী সংগঠন ফায়ার সার্ভিস প্রায় ১৫ঘন্টার প্রাণান্তকর চেষ্টা করেও শিশুটির নাগাল ছুঁতে পারেনি। উল্টো সংবাদ সম্মেলন করে গর্তে কোন শিশু নেই বলে উদ্ধার কাজের সমাপ্তি ঘোষণা দেন। অথচ সেই গর্ত থেকে মাত্র ঘন্টা খানেকের মধ্যে স্থানীয় তিন যুবক ঐ শিশুটিকে উদ্ধার করে আনেন। পরে শিশুটির মৃত্যু হয়। শিশু জিয়াদ গর্তে পড়া এব্ং তাকে সরকারের উন্নত ও দক্ষ প্রযুক্তিবিদরা তুলে আনতে না পারার ব্যর্থতার চেয়েও বড় বাস্তবতা হচ্ছে মূলত সরকারই দেশটাকে যেন গভীর গর্তে নিমজ্জিত করেছে।
সুতরাং জিয়াদকে যেমন সরকারের উন্নত প্রযুক্তি ও প্রযুক্তিবিদরা তুলে আনতে পারেনি, গভীর খাদে নিমজ্জিত দেশটাকেও তারা তুলে আনতে পারবেনা। তার জন্য প্রয়োজন ঐ তিন যুবকের মতো সৎ সাহসী সৈনিকের। আর দেশের এ ক্রান্তিকালে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রসেনার সৎ, আদর্শিক ও নির্ভীক-সাহসী মুজাহিদরাই পারবে এই প্রিয় বাংলাদেশের ভূলুন্টিত মানবতা, বিশৃঙ্খল সমাজব্যবস্থাকে সত্যিকারের সোনার বাংলাদেশ রূপে গড়ে তুলতে। তাই আসুন আজকের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে শপথ নিই প্রিয় নবীর নিষ্কলুষ আদর্শ গ্রহণে সুন্নিয়ত ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে অংশ গ্রহণ করে দেশটাকে প্রকৃত সোনার বাংলায় গড়ে তুলি।
No comments:
Post a Comment