মুহাম্মদ জামাল উদ্দীন রব্বানী*
২০০২ সালে যখন শহীদ হালিম-লিয়াকত স্মৃতি বৃত্তি শুরু হয় তখন হাতেগুনা মাত্র কয়েকটি বৃত্তি পরীক্ষা বিক্ষিপ্তভাবে বিভিন্ন অঞ্চলে চালু ছিল। অনেক এলাকায় তো সরকারী বৃত্তি পরীক্ষা ছাড়া অন্য কোন প্রতিষ্ঠান বৃত্তি পরীক্ষা নিতে পারে তা বিশ^াসই করত না। কালেরপরিক্রমায় সেই বৃত্তি পরীক্ষা এখন তীব্র প্রতিযোগীতায় লিপ্ত। পাড়ার সংগঠন থেকে শুরু করে হঠাৎ পয়সাওয়ালা হওয়া ব্যক্তিরাও একটু নিজের নাম কুড়াতে নামে বেনামে বৃত্তি পরীক্ষার আয়োজন করছে। আবার অনেকেই বৃত্তি পরীক্ষার অন্তরালে ব্যবসাও করে যাচ্ছে।
প্রত্যেক ভালো কিছুর বিপরীতে মন্দ লোকের মন্দ চিন্তাভাবনাও কাজ করে। তারা চায়, এই ভালোটাকে ব্যবহার করে দু’চার পয়সা কামিয়ে নিতে। তাই বলে ভালো কোন পদক্ষেপ বা কর্মকান্ডকে ঐ মন্দ কর্মকান্ডের সাথে এক করে তা বন্ধ করে দেয়া সঠিক বিচার নয়।
ইদানিং একটি কুচক্রীমহল ‘ধান্দাবাজ বৃত্তি পরীক্ষা’ গুলোর সাথে দেশের সর্ববৃহৎ ও সবচেয়ে পুরনো বেসরকারী বৃত্তি ‘শহীদ হালিম-লিয়াকত স্মৃতি বৃত্তি পরীক্ষা’কে জড়িয়ে এ অপপ্রচার চালাচ্ছে যে, “বৃত্তির নাম দিয়ে এরা ব্যবসা করছে”। আসলে কি তাই? নাকি সারাদেশে হালিম-লিয়কাত স্মৃতি বৃত্তি পরীক্ষার অভাবনীয় সাফল্য ও অবদান দেখে ঈর্ষাণিত হয়ে এর বিরুদ্ধে উঠে পড়ে লেগেছে? এ ষড়যন্ত্রকারী কুচক্রীমহলকে কি করে বুঝায় যে, টাকার আয়-ব্যয়ের লাভ-ঘাটতির চেয়ে শিক্ষা ও শিক্ষার্থীর মধ্যে যে প্রেরণা এই হালিম-লিয়াকত স্মৃতি বৃত্তি যুগাচ্ছে তা টাকার অঙ্কে হিসাব করা যাবেনা। তবুও তাদেরকে আমাদের প্রতিটি উপজেলায় বৃত্তি কমিটির সাথে মুখোমুখি বসে আয়-ব্যয়ের ফারাক দেখার অনুরোধ রইল। আর সত্যিকারের লাভের হিসাব যদি দিই- তাহলে তাদেরকে এ্যরিস্টটলের কাছে নিয়ে যেতেই হয়।
আমরা জানি, শিক্ষক তারা যারা শিক্ষার্থীদের পড়ান বা জ্ঞান দান করেন। শিক্ষা গ্রহণ ব্যতিরেখে কেউ শিক্ষিত হতে পারেনা। যদিও এর ব্যতিক্রম নজীর পৃথিবীর ইতিহাসে আছে। আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুনিয়াতে কারো কাছ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেননি। তবুও তিনি ছিলেন জ্ঞানের শহর। তিনি বলেছিলেন, ‘আমি জ্ঞানের শহর, আলী ঐ শহরের দরজা’। অন্যত্র তিনি বলেন, ‘আমি শিক্ষক হয়েই দুনিয়াতে প্রেরিত হয়েছি’। লেখা-পড়া না শিখে শিক্ষক বা জ্ঞানের শহর হওয়া এটা আমাদের নবীজির জন্য সম্ভব হলেও সবার জন্য এরূপ নয়। আমাদেরকে শিক্ষকের কাছ থেকে শিখেই শিক্ষিত হতে হয়েছে। এজন্যই পৃথিব্যাপী শিক্ষালয় বা বিদ্যালয় গড়ে উঠেছে। বিদ্যালয়গুলোতে প্রয়োজন অনুসারে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হয়ে থাকে আর শিক্ষার্থীরা সেখানে গিয়ে প্রয়োজনীয় জ্ঞান অর্জন করে থাকে। এই শিক্ষকদের মধ্যে অনেকেই শিক্ষার্থীদের কাছে ‘ভালো শিক্ষক’ হিসেবে সমাদৃত। ভালো শিক্ষক কে? এই প্রশ্নের জবাবে শিক্ষার্থীদের ১০০ জনের মধ্যে ৯৯ জনই এ উত্তর দিবে যে, যিনি শ্রেণিতে ভালো পাঠদান করেন তিনিই ভালো শিক্ষক। কিন্তু এ্যরিস্টটল বলছে, যিনি ভালো পড়ান তিনি ভালো শিক্ষক বটে, সর্বোৎকৃষ্ট শিক্ষক নন। তিনি শিক্ষকদের চার শ্রেণিতে ভাগ করেছেন। তাঁর মতে, “১। সেই হলো ‘ভালো শিক্ষক’ যিনি শ্রেণিতে শিক্ষার্থীদের পড়ায়। ২। সেই হলো ‘অপেক্ষাকৃত ভালো শিক্ষক’ যে শ্রেণিতে শিক্ষার্থীদের পড়ায় ও লেখায়। ৩। সেই হলো ‘সবচেয়ে ভালো শিক্ষক’ যে শ্রেণীতে শিক্ষার্থীদের পড়ায়, লেখায় ও টীকা টিপ্পনী করে দেয়। ৪। আর সেই হলো ‘সর্বোৎকৃষ্ট শিক্ষক’ যে এর কোনটিই করে না কিন্তু শিক্ষার্থীদের অনুপ্রাণিত করে।”
তাহলে যে শিক্ষক পড়ায়না, লেখায়না, নোট বা টীকা টিপ্পনীও করে দেয়না তিনিই হলেন সর্বোৎকৃষ্ট শিক্ষক। এখানেই ‘শহীদ হালিম-লিয়াকত স্মৃতি বৃত্তি পরীক্ষা’ সর্বোৎকৃষ্ট শিক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ। কারণ এ বৃত্তি পরীক্ষা কোন শিক্ষার্থীকে পড়ায়না, লেখায়না, এমনকি নোট বা টীকা টিপ্পনীও করে দেয় না। শুধুমাত্র নির্দিষ্ট সিলেবাসের মধ্য থেকে একটি প্রশ্নের মাধ্যমে ১০০ নম্বরের একটা পরীক্ষা নেয় আর তার নিখুত মূল্যায়নের মাধ্যমে মেধাবী শিক্ষার্থীদের কৃতিত্বের স্বীকৃতি দিয়ে দারুণভাবে অনুপ্রাণিত করে। তাদেরকে আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানে দেশের গুণীজনদের মাধ্যমে সনদ বা ক্রেস্ট দিয়ে সম্মানিত করে। সে অনুষ্ঠানে গুণীজনরা তাদের ব্যক্তিগত অর্জনের কথা ও সফল হওয়ার প্রেরণার কথা তাদেরকে শুনায়। এতে শিক্ষার্থীরা খুবই গর্ববোধ করেন ও দারুণ অনুপ্রাণিত হয়। বিশাল অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে সনদ বা ক্রেস্ট গ্রহণ করা বা পুরস্কার নেয়া একজন শিক্ষার্থীকে কত বেশী অনুপ্রাণিত করে, জীবনের গতিপথকে পাল্টে দেয় তা ঐ শিক্ষার্থী ও তার গর্বিত অভিাভাবকরাই ভালো অনুধাবন করতে পারেন। তবে আমরা অনুষ্ঠানে থেকে তাদের চিক্চিক্ করা উদ্ভাসিত মুখখানা দেখে অনুধাবন করতে পারি যে, আজ তারা কত খুশি, কত অনুপ্রাণিত। যখন তাদের অনুভুতির কথা জানতে চাই, তখন তারা অকপটেই বলে থাকে, ‘আমরা এই বৃত্তি পেয়ে যে সনদ বা স্বীকৃতি পেয়েছি তাতে দারুণ খুশি, তবে আমরা সফলতার যে সিঁড়ি হালিম-লিয়াকতের পথ ধরে পেয়েছি সেটি ধরেই সফলতা স্বর্ণ চুড়ায় পৌঁছতে চায়।” তখন আমি ভাবি, একজন শিক্ষক একটি অঙ্ক শেখাতে বা ইংরেজী, বিজ্ঞান বা অন্যান্য বিষয়ের পড়া শেখাতে কত চেষ্টাই না করে থাকে, কিন্তু ঐ শিক্ষার্থীর কাছে লেখা-পড়া ‘বিষ’ মনে হয়। আর এখন একটি মাত্র কাগজের সনদ বা প্লাস্টিকের ক্রেস্ট তার জীবনের গতিপথকেই পাল্টে দিয়েছে। কত বড় শিক্ষকের ভূমিকায় না পালন করেছে শহীদ হালিম-লিয়াকত স্মৃতি বৃত্তি।
সক্রেটিসও এই কথা বলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘আমি আমার ছাত্রদের শেখায় না, আমি তাদের শিখতে উদ্বুদ্ধ করি।’ সক্রেটিসের কথার সুত্রধরে আমরাও বলতে পারি ‘শহীদ হালিম-লিয়াকত স্মৃতি বৃত্তি’ কোন শিক্ষার্থীকে পড়ায়না বা শেখায়না বটে তাদেরকে বৃত্তির প্রদান করে এবং অনুষ্ঠানে গুণীজনদের মুখোমুখি করে তার শিক্ষা জীবনকে উদ্বুদ্ধ বা অনুপ্রাণিত করে।
অনেকেই প্রশ্ন তুলতে পারেন, সবাইকে তো বৃত্তি দেয়া হয়না বা পুরস্কৃত করা হয়না। তাহলে তারা? আমি তাদের বলব, যারা বৃত্তি পায় না, তারা হতাশ হওয়ার পরিবর্তে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয় যে, এবার পারিনি আগামীবার অবশ্যই পারব। এই বৃত্তি পাইনি তো অন্য বৃত্তি অবশ্যই পেতে হবে। এভাবে তারা অনুপ্রাণিত হয়।
সবশেষে এটাই দৃঢ় প্রত্যয়ে বলতে চাই, ‘শহীদ হালিম-লিয়াকত স্মৃতি বৃত্তি’ কোন ব্যবসা করার জন্য গঠিত হয়নি। যারা এ বৃত্তি পরীক্ষা দেশব্যাপি আয়োজন করছে তারা সবাই দেশপ্রেমিক ছাত্র-শিক্ষক-সংগঠন। সরাকারের পাশাপাশি শিক্ষাখাতে অবদান রাখার উদ্দ্যেশে এ বৃত্তি পরীক্ষার আয়োজন। আমরা মনে করি, শিক্ষাকে এগিয়ে নেয়া সরকারের একার দ্বারা সম্ভব নয়, সকল সচেতন নাগরিককে সরকারের সহযোগীতা করা উচিৎ। এ নৈতিকতাবোধ থেকেই শিক্ষার্থীদেরকে উদ্বুদ্ধ বা অনুপ্রাণিত করে দেশের শিক্ষার হার বাড়ানো বা মেধার বিকাশ করার জন্য আমাদের পথচলা। আশা করি আমাদের আগামীর পথচলা আরো মসৃণ ও কন্টকমুক্ত হবে। আর এ মহৎ কাজে দেশপ্রেমিক বিত্তবান-শিক্ষাবীদ-বুদ্ধিজীবি-ছাত্র-শিক্ষক-অভিাভাবকদের বরাবরের মতোই পাশে পাবো ইনশাআল্লাহ।
* মুহাম্মদ জামাল উদ্দীন রব্বানী, কেন্দ্রীয় সচিব, শহীদ হালিম-লিয়াকত স্মৃতি বৃত্তি পরিচালনা কমিটি।
No comments:
Post a Comment