ধর্মঃ থাকবে কি ?
মুহাম্মদ জামাল উদ্দিন রব্বানি
সম্প্রতি দেশে নাস্তিকদের বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন চলছে। অভিযোগ ওঠেছে, বিভিন্ন সামাজিক সাইটে, বিশেষ করে ইন্টারনেট ব্লগে কতিপয় ধর্মদ্রোহী নাস্তিক আল্লাহ, ইসলাম ও ইসলামের নবী মুহাম্মদ (সঃ) এর বিরুদ্ধে আপত্তিকর মন্তব্য পোষ্ট করেছে । এ অভিযোগটি তখনই ওঠে যখন দেশে ৪২ বছর পর ৭১ এর মানবতা বিরুধী অপরাধীদের বিচারের রায় দিতে শুরু করেছে। বিচারের রায়কে বাঁধাগ্রস্ত করতে এবং যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লাসহ সকল যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবিতে শাহবাগের আন্দোলনকে বানচাল করতে একটি গোষ্টি মরিয়া হয়ে ওঠছে এটা যেমন সত্য, তেমনি সরকারের আশ্রয়ে প্রশ্রয়ে কতিপয় নাস্তিক কুলংগার ইসলামের বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্রমূলক বিষোদগারে মেতেছে এটাও সত্য। সবচেয়ে বড় সত্য হচ্ছে, আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থা যে দিকে এগিয়ে চলেছে সেটাও ইসলাম ও ধর্মের জন্য কতটা শুভ। কারণ দেশে দুটি বড় রাজনৈতিক দলের কেউ চায় ধর্মনিরপেক্ষ আর কেউ চায় বাঙালী জাতিয়তাবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থা। যদিওবা দুটি দলেই একাধিক ইসলামী দল রয়েছে এবং তারা জোঠবদ্ধ । তথাপি কোন দলই ধর্মীয় বিধি নিষেধের তোয়াক্কা করেনা। তোয়াক্কা করেনা ইসলামী আদর্শ ও কৃষ্টি-কালচারের । আজ ধর্মের কথা বললে তিনি সাম্প্রদায়িক। দাঁড়ি রাখলেই তিনি জঙ্গি । টিভি সিনেমাগুলোতে দাঁড়ি- পাঞ্জাবী ওয়ালা হুজুরদের তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করা হচ্ছে। ধর্মীয় রাজনীতি বন্ধের পাঁয়তারা করছে । মূলত এসব কলকাঠি নাড়ছে যারা তাদের বড় একটি অংশ নাস্তিক ভাবাপন্ন । চলে-বলে-কৌশলে তারা প্রগতির ধুয়ো তুলে রাজনীতির গাধার পিঠে চড়ে আল্লাহর অস্তিত্ত্বের বিশ্বাসকে মানুষের অন্তর থেকে উঠিয়ে দিয়ে সৃষ্টির সেরা জীব মানুষকে পশুর কাতারে নামিয়ে আনতে চেষ্টা করছে । এমন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আমাদের ভাবতে হবে ধর্ম নিয়ে ।
একটা বিষয় সকলের দৃষ্টিগোচর করাতে চায়, নাস্তিকদের বিরুদ্ধে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত ও হেফাজতে ইসলাম ঢাকা ও চট্টগ্রামে বড় বড় প্রতিবাদ সমাবেশ করেছিল। দুটি দলই তাদের সমাবেশ থেকে ১২ দফা ও ১৩ দফা দাবি পেশ করেছিল। যদিওবা আভিযোগ রয়েছে হেফাজতে ইসলাম জামাআতে ইসলামকে রক্ষার জন্য মাঠে নেমেছে। দু’দলের দাবিগুলোর মধ্যে কিছু বৈসাদৃশ্য থাকলেও নাস্তিকদের বিচারের দাবির ক্ষেত্রে এক ও অভিন্ন দাবি পরিলক্ষিত হয় । দু’দলই ধর্ম অবমাননারকারীর সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদন্ড দাবি করেছেন । সুতরাং এটা স্পষ্ট, আর যাই হোক ধর্ম ও ইসলাম রক্ষায় এবং ধর্মদ্রোহী নাস্তিকদের বিরুদ্ধে মুসলমানেরা ঐক্যবদ্ধ। আর নাস্তিকদেরও এ কথা মনে রাখা উচিত, ইসলাম কারো ফুৎকারে নিভে যাওয়ার ধর্ম নয়।
তবুও যে যাই বলুক সাম্প্রতিককালে নাস্তিকদের উত্থান ব্যাপকহারে বেড়ে চলেছে । ‘পিউ ফোরাম অন রিলিজিয়ন অ্যান্ড পাবলিক লাইফের দ্য গ্লোবাল রিলিজিয়াস ল্যান্ডস্ক্যাপ ’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ১৬ শতাংশের কোন ধর্ম নেই । অর্থ্যাৎ বিশ্বে প্রতি ছয়জনে একজন মানুষ নাস্তিক তথা ধর্মহীন। ( সমকাল-১৩/১২/১২ইং) এটি সংখ্যার বিচারে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অংশে পরিণত হয়েছে । প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বের ৬৯০ কোঠি বা ৮৪ শতাংশ মানুষ কোন না কোন ধর্ম মানে ।তাদের হিসেবমতে ৩১.৫ শতাংশ মানুষ খ্রিষ্ট ধর্মাবলম্বী যা সংখ্যায় ২২০ কোঠি, ২৩ শতাংশ মানুষ ইসলাম ধর্মাবলম্বী যা সংখ্যায় ১৬০ কোঠি এবং ১৬ শতাংশ মানুষ ধর্মহীন যা সংখ্যায় ১১০ কোঠি। এ ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, তারা হিন্দুদেরকেও টপকে গেছে। বিশ্বে প্রায় ১০০ কোঠি মানুষ হিন্দু ধর্মাবলম্বী । আর বৌদ্ধ রয়েছে ৫০ কোঠি ।
উপরোক্ত প্রতিবেদন থেকে বুঝা যায়, নাস্তিকরা এগিয়ে আসছে । তার মানে তারা তাদের মিশন অত্যন্ত সফলভাবে বাস্তবায়ন করে চলেছে । কিন্তু কীভাবে ? একদম সহজ উত্তর, অন্যের ঘাড়ে চড়ে । আমাদের বাংলাদেশের দিকে তাকালে বুঝা যায় তারা কিভাবে সরকারের ঘাড়ে চড়ে দাঁপিয়ে বেড়াচ্ছে । আধুনিকতার চমৎকার ব্যানার সামনে রেখে, ধর্মীয় আদর্শকে ধর্মান্ধতা বলে অপপ্রচার করে, বিনোদনের নামে যৌনতাকে সমাজে অবাধ করে দিয়ে, নারী স্বাধীনতার নামে নারীদেরকে পণ্যের মতো ব্যবহার করে, বাক স্বাধীনতার নামে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয়া ইত্যাদি কাজ গুলো করে যাচ্ছে তারা দিনের পর দিন ।
অথচ ধর্ম তথা ইসলাম শুধু একটি ধর্ম নয়, একটি পূর্ণাঙ্গ দীন ও জীবন বিধান । আকিদা- বিশ্বাস থেকে আরম্ভ করে নামায, রোযা, হজ্জ, যাকাত, লেনদেন, ব্যবসা-বাণিজ্য, সামাজিক, পারিবারিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও আন্তর্জাতিক বিষয়াদিসহ দাওয়াত, জিহাদ , ইহসান ও আধ্যাত্নিক পরিশুদ্ধি এককথায় জীবনের সমস্ত বিষয়ই ইসলামের মধ্যে রয়েছে । জীবনের এমন কোন দিক বা ক্ষেত্র নেই যেখানে ইসলামের সঠিক দিক- নির্দেশনা নেই ।
আজকে আমরা যেগুলোকে আধুনিক ও যুগোপযোগী বলে গ্রহণ করেছি তা কি সত্যিই যুগোপযোগী ? নাকি যুগের সবচেয়ে বড় বেহায়াপনা ? যে সমাজ ব্যবস্থায় দেশ চলছে তা কি সুশাষণের ভিত্তিতে চলছে ? নাকি শোষণের ভিত্তিতে ? যে অর্থনৈতিক ব্যবস্থা আমাদের রয়েছে তা কি মানুষের মুক্তি দিতে পেরেছে ? নাকি আইয়্যামে জাহিলিয়ার সে দাস প্রথার দিকে ফিরে যাচ্ছে ? নারী স্বাধীনতার নামে যা করা হচ্ছে আদৌ কি তা নারীদের স্বাধীনতা দিয়েছে ? নাকি নারীদের ভোগের সামগ্রীতে পরিণত করেছে ? একটা উদাহরণ দেই-
“ দু’জন মুসলিম নারী, একজন ইসলামী আদর্শ মতে হিজাব পড়ে লেখা-পড়া থেকে শুরু করে হাট-বাজার, লেনদেন, চাকরী ইত্যাদি সব করছে, অন্য নারীটি তার লাজুক শরীরটাকে প্রায় অনাবৃত (টিভি সিনেমাতে যা থাকে) এ রকম একটা পোশাক পড়ে কাজগুলো করছে “। কোনটা সভ্য এবং নিরাপদ ? নিশ্চয়ই প্রথমটি । এখানে শরীর উলংগ রাখার মধ্যে আধুনিকতা কোথায় বুঝে আসেনা ।
গত ১৭ মে ’১৩ সাপ্তাহিক ২০০০ এ জাকির তালুকদার নামে এক লেখক ‘তালেবে এলমকে নিয়ে ‘ নামক প্রবন্ধে লিখছেন – পাঞ্জাবী টুপি পরিহিত কোন মাদ্রাসা ছাত্র কোন কিশোরী- তরুণী- যুবতীর স্বপ্নকল্পনায়ও কোন অস্তিত্ব নেই । কারণ তারা দেখতে স্মার্ট নয় । এই হলো আমাদের আধুনিক মুসলিমদের আধুনিকায়ন ।
এই যে ধর্ম বিষয়ে এ মতামতটুকু লিখলাম, এ গুলোকে ‘বদর উদ্দিন উমর’রা বলবেন, ইহকালের চিন্তা পরকালের কর্মসূচী। আবুল তাবুল সব যদি ফ্যাশন হয় আর ইসলামী আদর্শগুলো যদি হয় বাতুলতা ; তাহলে বদর উদ্দিন উমরদের ছদর ভদর মার্কা উদ্ভট চিন্তাধারাগুলো বদহজমপূর্বক দেশ বর্বাদ করা ছাড়া কোন উপায় নেই ।
অথচ মুমলমান হিসেবে আমাদের কমিটমেন্ট ছিল – ‘ আল্লাহ ও তাঁর রাসূল কোন বিষয়ে নির্দেশ দিলে কোন মুমিন পুরুষ কিংবা নারির সে বিষয়ে ভিন্ন সিদ্ধান্তের অধিকার থাকবেনা । কেউ আল্লাহ ও রাসূলকে অমান্য করলে সে তো স্পষ্টই পথভ্রষ্ট হবে । ( সূরা আহযাব- ৩৩;৩৬)
দূর্ভাগ্যের বিষয়, আমরা আজ সেই কমিটমেন্ট থেকে যোজন যোজন দূরে । আমাদের সীমাবদ্ধ জ্ঞানের উদ্ভট কুচিন্তা ধারা হলো আধুনিক আর অসীম কুদরতের মালিক আল্লাহর কল্যাণময়ী নির্দেশনা হলো অপাঙতেয়। কিন্তু এ কথা ভুলে গেলে চলবে না, পৃথিবীতে অনেক ক্ষমতাধর ব্যক্তি ছিল যারা মনে করেছিল তারাই সবকিছু । ধর্ম তাদের নিজস্ব মতের ব্যাপার । তারাই ধর্ম রচনাকারী । কালের পরিক্রমায় তারা আজ ধ্বংসপ্রাপ্ত । একদিন তাদেরকে সর্বময় ক্ষমতার মালিক মহান আল্লাহর কাছে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে । আর তোমরাও তার বাইরে নও । ধর্ম থাকবে আজীবন , নিঃশ্বেষ হয়ে যাবে তোমরা।
No comments:
Post a Comment