মুহাম্মদ জামাল উদ্দীন রব্বানী
(চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের সামনে থেকে হরতালের ঘোষণা দেয়া হয়)
বাংলাদেশসহ পাক-ভারত উপমহাদেশে সুন্নীয়তের আন্দোলনের অপ্রতিদ্বন্ধী একটি নাম বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রসেনা। এ সংগঠনটির মাত্র ৩৬ বছরের ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে এটা প্রমাণিত হবে হাজার বছরের সুন্নীয়তের আন্দোলনে ছাত্রসেনার আন্দোলনই অন্যতম। এ মুহুর্তে ছাত্রসেনার আন্দোলন ছাড়া অন্যকোনভাবে সুন্নীয়তকে প্রতিষ্ঠার বিকল্প নাই। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এ সংগঠনের জোরালো যে ক’টি আন্দোলন সুন্নীয়তকে বাংলার বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড় করিয়ে রেখেছে তার মধ্যে অন্যতম একটি ফারুকী আন্দোলন। বলছি শায়খ আল্লামা নুরুল ইসলাম ফারুকী (রহ:)কে শাহাদাতের পরবর্তীতে তাঁর নৃশংস হত্যার বিরুদ্ধে এক তীব্র আন্দোলনের কথা। যে আন্দোলন না হলে হয়তো সুন্নীয়ত যে বাংলাদেশে আছে সেটাই মানুষ বিশ্বাস করতো না। সরকারসহ প্রশাসন জানতো না সুন্নীয়তের শক্তির কথা। এই এক আন্দোলনই দেশ-বিদেশে সুন্নীয়তের শক্তিমত্তা কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
২০১৪ সালের ২৭ আগষ্ট। এ দিন সন্ধ্যায় রাজধানী ঢাকার রাজাবাজারে নিজ বাসায় খুন হন বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের প্রেসিডিয়াম সদস্য, বাংলাদেশে সুন্নীয়তের প্রচার-প্রসারে মিডিয়া আলোচক, বিশিষ্ট গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব ইসলামী চিন্তাবিদ শায়খ আল্লামা নুরুল ইসলাম ফারুকীকে সুন্নী বিরোধী জঙ্গিগোষ্ঠি অত্যন্ত নৃশংসভাবে জবাই করে হত্যা করে। এ খবর যখন মিডিয়ার কল্যাণে সারাদেশ-বিদেশে ছড়িয়ে পড়ে তখন ঘৃণ্য এই হত্যার বিচার ও হত্যাকারীদের দ্রæত গ্রেপ্তারের দাবীতে প্রথম আন্দোলনের ডাক দেয় বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রসেনা। অবশ্য আমাদের কর্মসূচির প্রদানের আগেই সেনার বীর মুজাহিদরা রাস্তায় নেমে পড়ে সাথে সাথে। কারণ আমরা তখনো অপেক্ষা করছিলাম আমাদের মুরব্বীদের কর্মসূচির দিকে। যেহেতু ফারুকী বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের নেতা। ঘটনার পরপর আমি ফ্রন্ট মহাসচিব আল্লামা এম. এ. মতিন সাহেবের সাথে কথা বলার চেষ্টা করলাম। কিন্তু উনার ফোন ব্যস্ত পেলাম। অনেক্ষন পর উনার সাথে কথা বলার সুযোগ পেলেও কর্মসূচির কোন সুনির্দিষ্ট ইঙ্গিত না পেয়ে আমি আমার সভাপতি নুরুল হক চিশতি ভাইয়ের সাথে আলাপ করে উনাকে ঢাকায় আসার জন্য অনুরোধ করলাম। চট্টগ্রামে যেহেতু সবচেয়ে বড় প্রতিবাদ বিক্ষোভ হবে তাই আমি চট্টগ্রামের আন্দোলনকে দেখাশুনার জন্য চট্টগ্রামেই থেকে গেলাম। ঐরাতে আমি সভাপতি মহোদয়সহ আমাদের নেতৃবৃন্দের সাথে ফোনালাপ করে প্রথমে পরের দিন সকাল ৮ টার মধ্যে ঢাকা- চট্টগ্রাম ও চট্টগ্রাম-কক্সবাজারসহ দেশের সকল মহাসড়ক সমুহে বেরিকেট সৃষ্টি করার সিদ্ধান্ত নিলাম। এর পরে ঢাকা-চট্টগ্রামসহ সকল জেলা শহরে বিক্ষোভ মিছিল করার সিদ্ধান্ত নিলাম। রাত কাটলো ফোনে ফোনেই।
(হরতালের পরদিন পত্রিকার পাতায়)
সকালে ওঠে রেডি হয়ে রাস্তায় নামতে দেখি গাড়িঘোড়া কিছুই নেই। তার মানে বেরিকেট সময়ের অনেক আগেই শুরু হয়ে গেছে। অনেক কষ্টে বর্তমান অর্থ সম্পাদক শাহাদাত হোসাইনকে নিয়ে চট্টগ্রামের মুরাদপুরে যেখানে আমাদের জমায়েত হওয়ার কথা সে স্পটে গেলাম। স্মরণ করিয়ে দেয়া দরকার, ঘটনার রাত এ মুরাদপুরেই সবচেয়ে বেশি বিক্ষোভ দেখিয়েছিল আমাদের নেতাকর্মীরা। যা প্রত্যেকটি মিডিয়া প্রচার করেছিল। আমরা সেখান থেকে বিশাল এক মিছিল নিয়ে রওয়ানা হলাম চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের দিকে। সেখানে ইসলামী ফ্রন্ট নেতৃবৃন্দ সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে কর্মসূচি ঘোষণা করবেন। মিছিলের অবস্থা আর সাধারণ মানুষের অবস্থা দেখে সে মিছিলের ¯্রােত বেড়ে তা নিউ মার্কেট হয়ে ঘুরে আসে প্রেস ক্লাবের সামনে। সেখানে গণমাধ্যম কর্মীরা আমাদের কর্মসূচি চাইলে আমি সভাপতি মহোদয়সহ নেতৃবৃন্দের সাথে আলোচনা করে খুনিদের গ্রেপ্তারের ২দিনের আল্টিমেটাম দিয়ে ৩১ আগষ্ট পূর্ণ দিবস হরতালের ঘোষণা দিই। একই সাথে ঢাকায় সভাপতি মহোদয়ও হরতালের ডাক দেয়। যাতে আন্দোলন এক ভিন্ন মাত্রা পায়। বলতে কি, মিডিয়া কর্মী ও প্রশাসনের দৌড়-ঝাঁপ বেড়ে যায়। আর আমাদের কর্মীসহ সাধারণ সুন্নীদের মধ্যে আন্দোলনের এক তীব্রতা সৃষ্টি হয়। সবার মধ্যে মর্দে মুজাহিদ ভাব দেখা যায়। কিন্তু প্রেস ক্লাবে চলা আমাদের মুরব্বী নেতৃবৃন্দের কর্মসূচি হরতাল মুক্ত হওয়ায় কর্মীদের মাঝে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয় এমনকি মিডিয়া কর্মীরাও হরতাল হওয়া নিয়ে ধোয়াশার মধ্যে আমাদের বারবার প্রশ্নের সম্মুখিন করেন। এখানে উল্লেখ্য বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট নেতৃবৃন্দ কৌশলগত দিক দিয়ে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াত সমন্বয় কমিটি ব্যানারে আন্দোলন পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেন। আর আহলে সুন্নাত ইতিমধ্যে ১২ দফা ঘোষণার মাধ্যমে হরতালের বিরোদ্ধে অবস্থান নেয়ায় মূলত এ কঠোর কর্মসূচি থেকে বিরত থাকেন। কিন্তু আমরা হরতালের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করি। আমাদের দাবি একটাই হয়তো ফারুকীর খুনীদের গ্রেপ্তার কর নয়তো হরতাল পালন করবোই। এ ঘোষণায় অটল থেকে আমরা আহলে সুন্নাতের বিক্ষোভ মিছিলেও যোগ দেয়। এ মিছিল চলাকালে প্রশাসনের বিভিন্ন এজেন্সি ও দেশ-বিদেশের বিভিন্ন মিডিয়া হরতাল কর্মসূচি নিয়ে আমার বক্তব্য নিতে শুরু করে। বিবিসির শায়লা রোকসানা প্রায় ১৮ মিনিট ধরে ফারুকী ইস্যুতে হরতাল নিয়ে দলের সামর্থসহ বিভিন্ন বিষয়ে বক্তব্য রেকর্ড করে। যার কিছু অংশ ঐদিন রাতে প্রচার করে। এ সময় মনে হলো হরতালটি আন্দোলনের টনিক হিসেবে কাজ করেছে। না হয় মিডিয়া ও প্রশাসনের বিভিন্ন লোকজন এভাবে আমাদের উপর হুমড়ি খেয়ে পড়তো না। চ্যানেল ৭১ এর চট্টগ্রাম অফিস থেকে ফোন করে চ্যানেলটি রাত ১২ টার টক শো’তে কথা বলার জন্য আমাকে অনুরোধ করে। আমি আমার সভাপতি এবং মতিন সাহেবের সাথে কথা বলে ঐ লাইভ অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলাম। মনে হয় কোন চ্যানেলে লাইভ টক শো’তে ছাত্রসেনার কোন প্রতিনিধির কথা বলার এটাই প্রথম ঘটনা। আপনারা হয়তো দেখেছেন যেখানে রাজনীতি বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) আবদুর রশিদ, সাংবাদিক নেতা মন্জুরুল আহছান বুলবুলের মতো ব্যক্তিদের সাথে ছাত্রসেনার আন্দোলন বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। চট্টগ্রামের মতো ঢাকায়ও মিডিয়া কর্মীরা আমাদের আন্দোলনের বিষয়ে সভাপতি মহোদয়ের সাথে কথা বলেন। তিনিও হরতালের যৌক্তিকতা ও সামর্থের কথা জোর দিয়ে বজ্রকন্ঠে বলেছেন। ফলে ঢাকা চট্টগ্রামসহ সারাদেশে ফারুকীর বিচারের দাবিতে এক উত্তাল অবস্থার সৃষ্টি হয়।
(৭১ টিভিতে হরতাল ঘোষণার দিন টক শো'তে)
পরের দিন জুমাবার। আমরা মসজিদে মসজিদে দোয়া মাহফিল এবং নামায শেষে বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ সভার ডাক দিই। মিডিয়া কর্মীরা ছুটে যায় মসজিদে মসজিদে নিউজ কাভার করতে। পুলিশও সতর্ক অবস্থায় থাকে সাথে সাথে। সেদিনও আমরা হরতাল বিষয়ে ছিলাম অনঢ়। ইতিমধ্যে ঢাকা থেকে এক মহিলাসহ দুজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। মূলত তা ছিল আমাদের আন্দোলনকে বন্ডুল করার জন্য। কিন্তু আমরা তাতে দমে যায়নি। দেশ-বিদেশ থেকে আমাদের নেতাকর্মী সমর্থকরা যেকোন মূল্যে হরতালসহ আন্দোলন সফল করার প্রতিশ্রুতি দিতে থাকে। এর মধ্যে ঘরে-বাইরে থেকে হরতাল প্রত্যাহারের চাপও আসতে থাকে। নেতৃবৃন্দের যুক্তিও অমূলক ছিলনা কিন্তু আমাদেরও হরতাল প্রত্যাহারের সুযোগ ছিলনা। কেননা কর্মীদের প্রত্যাশার বাইরে যাওয়ার সাহস আমাদের ছিলনা। হরতাল হবে এটা ধরে নিয়ে আমি সভাপতিসহ নেতৃবৃন্দের সাথে হরতাল ও আন্দোলন বাস্তবায়নের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছিলাম। সাথে উর্ধ্বতন নেতৃবৃন্দ বিশেষ করে মতিন সাহেবের পরামর্শও নিচ্ছিলাম। এরই মাঝে পটিয়ার ফ্্রন্ট নেতা আলহাজ্ব আলী হোসাইন ভাই আমাকে ডেকে নিয়ে ছোট্ট একটি পরামর্শ দিয়ে বলেছিলেন, তোমরা হরতাল প্রত্যাহার নয় বরং পূর্ণ দিবসের বদলে অর্ধ দিবসের সিদ্ধান্ত নাও। তিনি এর সফলতা বিফলতার বেশ ক’টি বিষয়ও তুলে ধরেছিলেন। যা আমার কাছে খুবই যুক্তিপূর্ণ মনে হয়। এটা মাথায় রেখে ২৯ আগষ্ট শনিবার আমি চট্টগ্রামের দলীয় অফিসে চট্টগ্রামে অবস্থানরত কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের সভা আহবান করি। আর ঢাকায় সভাপতির নেতৃত্বে ঢাকায় অবস্থানরত নেতৃবৃন্দরা বৈঠকে মিলিত হয় একই সময়। সত্যি কথা বলতে কি, আন্দোলনের দৌড়-ঝাঁপ এত বেশি তীব্র ছিল আমরা যারা চট্টগ্রামে ছিলাম তাদের তখন ঢাকায় যাওয়ার চিন্তাও করতে পারছিলাম না। কারণ আন্দোলনের মাত্রা অন্য যেকোন স্থান থেকে চট্টগ্রামে কয়েকগুণ বেশি ছিল।
শনিবার ঢাকা ও চট্টগ্রামে আমরা একই সাথে যোগাযোগ করে হরতাল সফল করতে বিভিন্ন দিক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করি। হরতাল বিষয়ে একটা নেগেটিভ ধারনা প্রশাসন-মিডিয়াসহ সাধারণ জনগণের আছে যে হরতাল মানে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ। যেটা নিয়ে আমাকে ৭১ টিভিসহ প্রায় প্রত্যেকটি মিডিয়া থেকে প্রশ্ন করা হয়েছিল। আমরা বারবার বলতে চেষ্টা করেছি যে আমরা কোন ভাঙাভাঙ্গি বা অগ্নিসংযোগের কর্মসূচি দেয়নি, দেবও না। তাই ঐ বৈঠকে আমি প্রস্তাব রাখলাম ভাঙাভাঙ্গি থেকে কর্মীদেরকে বিরত রাখার জন্য আমরা হরতাল পালনকালে মিছিল ও বক্তৃতা দেয়ার পাশাপাশি রাস্তায় দাঁড়িয়ে মিলাদ-কিয়াম ও দরুদ শরীফ আদায় করব। এটা হলে হরতালও শান্তিপূর্ণ হবে আর প্রশাসন মিডিয়াসহ সাধারণ জনগণও আমাদের হরতালকে ব্যতিক্রমী হরতাল হিসেবে মনে রাখবে। যা হবে অন্যান্য দলের জন্য মডেল আন্দোলন। আমার এ প্রস্তাব সবাই গ্রহণ করলে ঢাকায়ও তা জানিয়ে দেয়া হয়। এ ছাড়া দাবি আদায় না হলে ৩০ আগষ্ট ঢাকায় বিকাল ৩টায় এবং চট্টগ্রামে বিকাল ৪টায় হরতাল করার ঘোষণা দিয়ে সংবাদ সম্মেলন করার সিদ্ধান্ত হয়। সংবাদ সম্মেলনের লিখিত বক্তব্য তৈরী করার জন্য চট্টগ্রাম মহানগরের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক নুরুল্লাহ রায়হানকে দায়িত্ব দেয়া হয়। ঐ বৈঠকসহ চট্টগ্রামে আমার সাথে সার্বক্ষণিকভাবে ছিলেন কেন্দ্রিয় সহ-সভাপতি ইব্রাহীম খলিল, তখনকার সাংগঠনিক সম্পকদ সৈয়দ গোলাম কিবরিয়া, অর্থ সম্পদাক আজিম উদ্দীন আহমদ, প্রকাশনা সম্পদাক শাহাদাত হোসাইনসহ চট্টগ্রাম উত্তর, দক্ষিণ, মহানগর ও চবি শাখার সিনিয়র নেতৃবৃন্দ।
( হরতাল শেষে যমুনা টিভিতে বিশেষ সাক্ষাতকার)
সেকেন্ড ফুরিয়ে মিনিট, মিনিট ফুরিয়ে যায় ঘন্টা, ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষা করি। কখন খুনি গ্রেপ্তার হবে। হরতালের মতো কঠিন এক কর্মসূচির মাধ্যমে দেশের মানুষকে সামান্য সময়ের কষ্ট থেকেও আমরা মুক্ত রাখতে পারবো। কিন্তু না। প্রশাসনের কোন উদ্যোগই পরিলিক্ষিত হয়নি যে তারা খুনিদের গ্রেপ্তার করবে। শেষমেশ আমরা ৩০ আগষ্ট ঢাকা ও চটগ্রামে নির্ধারিত সময়ে সংবাদ সম্মেলন করে হরতাল পালন করার ঘোষণায় বহাল রাখলাম। সেদিন চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ার কর্মীদের অবস্থা দেখে আমি বিস্মিত হয়। প্রায় ১৮টি টিভি ক্যামরা সংবাদ সম্মেলনকে ঘিরে রেখেছিল। প্রিন্ট মিডিয়ার ফটো সাংবাদিকসহ অন্যান্য সাংবাদিকরা তো ছিলই। ঢাকায়ও তদ্রæপ সাংবাদিকরা হুড়োহুড়ি করে আমাদের নিউজ কাভার করেছিল। এমনকি সংবাদ সম্মেলন শেষ প্রায় সাথে সাথে সাংবাদিক ভাইয়েরা ফোন করে জানাচ্ছিলেন যে কার নিউজটি আগে প্রচার করা হচ্ছে। যে সাংবাদিকদের হাজার হাজার টাকা দিয়েও নিউজ কাভার করাতে পারিনি তারাই আজ নিউজ প্রচারের জন্য প্রতিযোগিতা শুরু করে দিয়েছে। উল্লেখ্য, ইতিমধ্যে বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের পক্ষ থেকেও সাংবাদিক সম্মেলন করে আমাদের হরতালকে সমর্থন দেয়া হয়।
অতপর: সেই ক্ষণ। শক্সকা আর উদ্বেগের মাঝেও সাহসটা ধরে রাখতে পেরেছিলাম অসংখ্য অগণিত কর্মী ভাইদের প্রাণপণ ত্যজিস্বতা ও নিরলস কর্মতৎপরতা দেখে। ৩১ আগষ্টের ভোর ৬ টা যেন অনেক দেরী একটা সময়। প্রায় নেতাকর্মী ভাইয়েরা রাস্তায় নেমে পড়েছিল ৬টার অনেক আগেই। রাতে ঢাকা ছেড়ে আসা নাইট কোচ গুলো আটকে দিয়েছে রাস্তায় রাস্তায়। পুলিশের জোর তৎপরতাও তাদের দূরে সরাতে পারেনি। এ অবস্থা দেখে ৬ টার পর যাদের রাস্তায় গাড়ি নামানোর দু:সাহস ছিল তারাও চুপসে যায়। শুধু ইঞ্জিন চালিত যানবাহন? সাইকেল-রিক্সা-ভ্যান, এমনকি দোকান পাটও বন্ধ হয়ে যায়। চট্টগ্রাম যেন এক নিস্তব্ধ শহর। এভাবে খবর আসছিল ঢাকায় সভাপতির নেতৃত্বে কড়াকড়িভাবে হরতাল পালিত হচ্ছে। আমাদের কর্মীরা ঢাকার বুকে বুক উঁচিয়ে গগণ বিদারী চিৎকারে ¯েøাগান তুলছে। ফারুকীর খুনিদের গ্রেপ্তারের তীব্র দাবি সরকারের কর্ণকুহরে পৌঁছাতে চেষ্টা করছে। ঢাকা, চট্রগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল, সিলেট ও রংপুরসহ সারাদেশে নবী প্রেমিক বীর সেনানী ভাইদের রাজপথে অবস্থানে পুরো দেশ অচল হয়ে যায়। খুনি জঙ্গিদের আস্তানাসহ বাতিলদের কিল্লা যেন দ্রোহের আগুনের জ্বলতে থাকে। সরকার, প্রশাসন, মিডিয়া এবং সাধারণ জনগণ অবাক হয়ে দেখে বীর মুজাহিদদের বীরত্বগাথা। ফারুকী বিচারের দাবি হয়ে ওঠে সকল জনগণের দাবি। সেদিন আমরা চট্টগ্রামের মুরাদপুর থেকে নিউমার্কেট মোড়, ফটিকছড়ি থেকে বাঁশখালি এবং টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া পর্যন্ত খবরাখবর রাখছিলাম। খানিক বাদে বাদে ফোন আসে কুমিল্লায় আমাদের ছেলেদের সাথে হেফাজতের সাথে সংঘর্ষ হয়েছে, পটিয়ায় ছাত্রলীগের গুন্ডারা আমাদের উপর হামলা করেছে, পাহাড়তলীতে আমাদের কর্মীদের উপর জামাত শিবির চোরগুপ্তা হামলা চালিয়েছে, বহদ্দার হাট থেকে আমাদের ৩জন কর্মীকে পুলিশ এরেস্ট করেছে। ঢাকায় পুলিশ আমাদের মিছিল করতে দিচ্ছেনা বা নারায়নগঞ্জে আমাদের উপর প্রতিপক্ষ হামলা করেছে। চাঁদপুরে রেল যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছে। এভাবে চলতে থাকে হরতালে প্রতিটি সময়। আমাদের দৌঁড়া দৌঁড়িও বাড়ে বেলা বাড়ার সাথে সাথে। আর আমাদের চেয়েও দৌড়া-দৌড়ি বেশি বাড়ে মিডিয়া কর্মীদের। মাদ্রসার এতিমখানার ৭ বছরের বাচ্চাটি থেকে শুরু করে জামেয়ার মুফাচ্ছির-মুহাদ্দিস-মুফতিরাও মাঠে নামে ¯েøাগান দেয়, মিছিল করে। তদ্রæপ ঢাকাসহ সারাদেশে। হরতালের সময় ফুরুতে ফুরুতে আমরা ঢাকা চট্টগ্রামের সেনা নেতৃবৃন্দ ফোনালাপে হরতাল পরবর্তী কর্মীসূচি ঠিক করে নিই। যেহেতু হরতাল শেষে গণমাধ্যম কর্মীদের মুখোমুখি হতে হবে। বেলা ২ টা বাজার সাথে সাথে ঢাকায় চিশতী ভাই আর আমি চট্টগ্রামে হরতাল শান্তিপূর্ণভাবে পালন করায় আমাদের নেতাকর্মীসহ সর্বস্তরের ব্যক্তিবর্গকে ধন্যবাদ জানাই। পরবর্তী কর্মসূচি আমরা ২ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম লালদীঘি মাঠে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের সমাবেশে ঘোষণা করার কথা বলি। হরতাল শেষে যমুনা টিভি থেকে চট্টগ্রাম স্টুডিওতে সন্ধা ৬টার খবরে সরাসরি বক্তব্য নেয়ার জন্য অনুরোধ করলে আমি, তখনকার সাংগঠনিক সম্পদক সৈয়দ গোলাম কিবরিয়া, অর্থ সম্পদাক আজিম উদ্দীন জনি ভাইসহ সেখানে তাদের অনুষ্ঠানে আমাদের সফল কর্মসূচির কথা তুলে ধরি এবং প্রশাসন, মিডিয়া, ড্রাইবার, শ্রমিক, ব্যাবসায়ীসহ জনগণের প্রতি ছাত্রসেনার পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি। এই দিন প্রথম আলোর চট্টগ্রামের ব্যুরো চীফ ফোন করে আমাদের হরতালকে ঐতিহাসিক, নজীরবিহীন এবং শান্তিপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করে। সেদিন ইলেকট্রনিক মিডিয়া, অনলাইন পত্রিকা এবং পরদিন প্রিন্ট মিডিয়া লীড নিউজসহ একাধিক রিপোর্টে আমাদের হরতালের চুলছেড়া বিশ্লেষণ তুলে ধরা হয়। শুধু পত্রিকা বা টিভিতে নয় সাধারণ জনগণ এমনকি বিরোধী মতবাদীরা পর্যন্ত আমাদের শান্তিপূর্ণ নজীরবিহীন হরতালের ভূয়সী প্রশংসা করে আমাদের সমর্থন দেয়। যে আন্দোলনটি শুধু ফারুকীর বিচারের দাবিকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেনি, সুন্নীদের অবস্থানকেও বিশ্ববাসীর নিকট সগৌরবে উপস্থাপন করেছে। প্রায়ই সবার মূল্যায়ন ছিল যে, এ আন্দোলন ছাত্রসেনাকে নয় শুধু সুন্নী জমাতকেও একশ বছর এগিয়ে দিয়েছে। অনেক আলেম-ওলামা, পীর-মাশায়েখ হয়তো আমাদেরকে স্বীকার করতে চাননা বা সহযোগীতা করতে চাননা। অথচ মাওলানা ফারুকী নয়, শফিউল নিজামী, প্রিন্সিফাল জালাল উদ্দীন আলকাদেরী সহ অসংখ্য নির্যাতিত আলেম-ওলামা, পীর-মাশায়েখদের বিপদে বীরত্বের সাথে রাজপথে নেমে লড়াই করেছে এ ছাত্রসেনা। আন্দোলনের ডাক দিয়ে বাতিলদের অন্তরে ভয়ের আগুন ধরিয়ে দিয়েছে এ ছাত্রসেনা। সরকার ও প্রশাসনের তোয়াজ না করে সুন্নীদের শক্ত অবস্থানকে সগৌরবে তুলে ধরেছে এ ছাত্রসেনা। সুতরাং তিন যুগ পূর্তির সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে সম্মানিত আলেম-ওলামা, পীর-মাশায়েখসহ সাধারণ সুন্নী মুসলিম ছাত্র-জনতাকে আহবান জানাই আসুন, সুন্নী হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে, সুন্নীয়তকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠা করতে, এদেশের মসনদে সুন্নীয়তের আদর্শ ভিত্তিক আইন প্রতিষ্ঠা করতে ছাত্রসেনার ভাইদের সাথে কাঁেধ কাঁধ মিলিয়ে এগিয়ে যাওয়ার শপথ করি। ইনশা’ল্লাহ ! আমরাই এ বাংলায় সুন্নীয়তের পতাকা উড্ডীন করবো। গড়বো শান্তির সমাজ।





No comments:
Post a Comment