Sunday, 4 August 2019

দেশ ও ধর্ম

মুহাম্মদ জামাল উদ্দীন রব্বানী


দেশ ও ধর্ম মানুষের প্রাণাধিক ভালোবাসার নাম। একটাকে বাদ দিয়ে অন্যটির চিন্তাও করা যায়না। পৃথিবীর সূচনা থেকেই ধর্মের অনুসরণ ও তার প্রতি ভালোবাসা যেমন মানুষের জন্মগত স্বভাব, তেমনি যে দেশে মানুষ জন্মগ্রহণ করে সেদেশের প্রতিও তার অকৃত্রিম ভালোবাসা প্রমাণিত। যুগে যুগে মানুষ যেমন নিজ ধর্মকে রক্ষার জন্য জীবনকে অকাতরে বিলিয়ে দিয়েছেন, তেমনি দেশ রক্ষায়ও মানুষ নিজের জীবনকে উৎসর্গ করেছেন। বরঞ্চ অনেকেই ধর্মকে দেশের চেয়ে হাজারগুণ বেশী প্রাধান্য দিয়েছেন । প্রয়োজনে তারা দেশ ছেড়েছেন তবু ধর্মকে ছাড়েনি।
মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মক্কা শরীফ থেকে মদীনা শরীফে হিজরত করেছিলেন তখন যাওয়ার পথে তিনি বারবার মক্কার দিকে ফিরে ফিরে তাকাচ্ছিলেন এবং বলেছিলেন, ‘হে আমার জন্মভূমি! যদি আমার মাতৃভূমির লোকজন আমাকে দেশ থেকে বিতাড়িত না করতো, তাহলে আমি কোন দিনই তোমাকে ছেড়ে যেতাম না।” এখানে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দেশের প্রতি যেমন ভালোবাসা প্রকাশ পেয়েছে তেমনি ধর্মের প্রয়োজনে দেশ ছাড়তেও তিনি দ্বিধা করেননি। তিনি তো ধর্ম এনেছেন পুরো পৃথিবীবাসীর শান্তির জন্য। সমগ্র মানুষের কল্যানের জন্য। শুধু মক্কাবাসীর জন্য নয়। অর্থাৎ নির্দিষ্ট কোন ভূখন্ডের জন্য নয়। তাই তিনি যখন মক্বায় ইসলামের মিশন প্রচার করে নির্যাতিত হচ্ছিলেন তখন আল্লাহর পক্ষ থেকে শিখিয়ে দেয়া একটি দোয়া তিনি বারবার পড়তেন। যার অর্থ- “ বল, হে আমার প্রতিপালক ! আমাকে প্রবেশ করাও কল্যাণের সাথে এবং আমাকে নিস্ক্রান্ত করাও কল্যাণের সাথে এবং তোমার নিকট থেকে আমাকে দান কর সাহায্যকারী শক্তি।” ( সূরা বণী ইসরাইল : ৮০)
ইমাম হাসান আল-বসরী, কাতাদা, ইবনে কাসীর, ইবনে জারীর আততাবারী উক্ত আয়াতের তাফসীরে বলেন, “প্রভু হয় আমাকেই রাষ্ট্র ক্ষমতা দান কর, আর না হয় অপর কোন রাষ্ট্রকে আমার সাহায্যকারী বানিয়ে দাও, যেন আমি তার শক্তি ও ক্ষমতার মাধ্যমে পৃথিবীর এই মহাভাংগন ও বিপর্যয়কে সংশোধন করতে পারি, অশ্লীলতা ও নাফরমানীর এই মহাপ্লাবনকে প্রতিরোধ করতে পারি এবং তোমার সুষম আইন ও বিধানকে চালু ও কার্যকর করতে পারি।”
আল্লাহর বাণীকে সমুন্নত করতে, ইসলাম ধর্মের সঠিক প্রচার-প্রসার ও প্রয়োগ করতে তাই তিনি নিজ মাতৃভূমি ত্যাগ করে তখনকার কুখ্যাত শহর ইয়াসরবে হিজরত করেছেন। যা পরবর্তীতে নবীজির কারণে মদীনাতুন নবী হয়। আর তার পরবর্তী ইতিহাস তো সবার জানা। 
এখন দেশে একটি কথা খুব জোরে শোরে প্রচার করা হচ্ছে যে, দেশ ও ধর্ম এক নয়। দেশের কোন ধর্ম থাকতে পারে না। হ্যাঁ, বাস্তব কথা। দেশের কোন ধর্ম থাকতে পারেনা। ধর্ম তো আচরণিক বিষয়, বিশ^াসের বিষয়। এটা দেশের সাথে নয় মানুষের সাথে সম্পর্কিত। কিন্তু যদি প্রশ্ন করি, ১৯৪৮ সাল থেকে ১৯৫২ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষের ভাষা ‘বাংলা’র জন্য আন্দোলন করেছে, ১৯৭১ সালে পাকিস্তানী হায়েনারদের শোষন থেকে ম্ক্তু হয়ে মাতৃভাষা ‘বাংলা’র নামে দেশের নাম ‘বাংলাদেশ’ রেখেছে। এখানে দেশ ও ভাষাকে তো আলাদা চোখে দেখা হয়নি। ভাষা তো মানুষের মুখের, দেশের নয়। কেন ভাষা থেকে দেশকে আলাদা করা হয়নি? আমাদের দেশের মানুষের জাতীয়তার পরিচয়ে বাঙালী বলতে স্বীকার করি, বাংলাদেশের সংবিধানেও তা স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। এখানে জাতি আর দেশকে আলাদা করা হয়নি। অথচ এদেশে বাঙালী ও বাংলা ভাষাবাসী ছাড়াও আরো অনেক জাতি ও ভাষার মানুষ রয়েছে। এখানে তো প্রশ্ন ওঠেনা। কেউ যদি বাংলাদেশে থেকে বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে অথবা বাঙালী জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে কথা বলে, তাকে দেশদ্রোহী বলে বিচারের মুখোমুখি করা হবে, কেউ কেউ অতি আবেগে দেশ থেকে বিতাড়নের দাবি তুলবে, তাহলে হাজার বছর ধরে লালিত ধর্মের আদর্শ প্রতিষ্ঠার কথা বললে কেন দেশ থেকে ধর্মকে আলাদা করার প্রশ্ন তুলা হয় ?
ভাষা যেমন একটি দেশের সাথে সংশ্লিষ্ট নয়, তেমনি ধর্মও শুধু একটি দেশের সাথে সম্পর্কিত নয়। পৃথিবীর অপরপ্রান্তে গেলেও যেমন একজন বাঙালী অপর বাঙালী বা বাংলা ভাষা জানেন এমন মানুষের সাথে বাংলা ভাষায় কথা বলতে পারে, ঠিক তেমনি ধর্মও মহান আল্লাহর বিশাল ভূখন্ডের যেকোথাও পালন করতে পারে।
এখানে অধিকাংশ মানুষ বাঙালী ও বাংলা ভাষাবাসী বলে যেমন এদেশের নাম বাংলাদেশ, তেমনি এদেশের অধিকাংশ মানুষ মুসলিম বা ইসলাম ধর্মে বিশ^াসী বলে এদেশকেও মুসলিম দেশ বলতে অসুবিধা কোথায়?
এখানে তাদের আরেকটি বড় প্রশ্ন, এদেশে তো শুধু মুসলিমরা নয়, হিন্দু-বৌদ্ধরাও বাস করেন। হ্যাঁ, বাস করেন, করবেন। তাতে অসুবিধা কোথায়। দেশের অধিকাংশের ভাষা বাংলাকে যেমন রাষ্ট্রীয় ভাষার মর্যাদা দেয়া হয়েছে, তাতে কোন অসুবিধা হয়নি, অন্য ভাষাও বিলুপ্ত হয়ে যায়নি। বরঞ্চ চলতি বছর থেকে তাদের ভাষায় বই রচনা করে সেসকল জাতির সন্তানদের হাতে তুলে দিয়েছেন শিক্ষার জন্য। তাহলে অধিকাংশ মুসলিমের দেশকে মুসলিম দেশ বললে কেন অন্য ধর্মের মানুষের অসুবিধার কথা আসে? আসলে তাদের খোড়া যুক্তি শুধুই ইসলাম ধর্মের প্রতি তাদের হিংসার ফল।
এখন দেশ যারা শাসন করছে, দেশের সব মানুষ কি তাদের সমর্থন করে? তারাও কি জোর গলায় বলতে পারবে যে, দেশের সব মানুষ ধর্মনিরপেক্ষতায় বিশ^াস করে? উত্তর যদি ‘না’ হয়, তাহলে বাকীদের কি দেশ থেকে বের করে দিয়েছে? নাকি তারা তাদের আদর্শ নিয়ে অন্য দেশে পালিয়ে গেছে? কোনটিই নয়।
অথচ ইসলামের ইতিহাসে দেখা যায়, প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মক্কার মানুষের দ্বারা নির্যাতন নিপীড়নের স্বীকার হচ্ছেন, শান্তি ও কল্যাণের ধর্ম ইসলামের বিধান প্রতিষ্ঠা আপাতত সম্ভব হচ্ছে না, তখন তিনি তাঁর মাতৃভূমির মানুষের সাথে হানাহানিতে লিপ্ত না হয়ে এমন একটি দেশ বেছে নিলেন যেখানে অত্যন্ত সুষ্টু ও সুন্দরভাবে আল্লাহর বিধানগুলো বাস্তবায়ন করা যায়। অত:পর তিনি মদীনায় গিয়ে সকল ধর্ম ও গোত্রের মানুষদের নিয়ে গঠন করলেন মহান আল্লাহ তায়ালা প্রদত্ত বিধান সম্বলিত ইসলামী রাষ্ট্র এবং তিনি হলেন সে রাষ্ট্রের প্রধান। মদীনা সনদ তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। যা পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম লিখিত সনদ হিসেবে স্বীকৃত। 
এখানে স্মরণ করিয়ে দেয়া যেতে পারে, যদি ইসলাম ধর্মে দেশ শাসন বা ধর্মীয় রাজনীতি না থাকে, তাহলে ইসলামের নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কেন নিজের দেশ ছেড়ে অন্য দেশে গিয়ে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করলেন? ওল্ড এবং নিউ টেস্টমেন্টে থেকে জানা যায়, শুধু আমাদের নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নয়, বনী ইসরাইলের নবীগণও রাষ্ট্র সংস্থার সংশোধনের চেষ্টা করেছেন এবং ভ্রান্ত নেতৃত্বের অবাধ সমালোচনা করেছেন। আমাদের পবিত্র কোরআন মজীদেও দেখা যায় হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম, হযরত মুসা আলাইহিস সালাম, হযরত দাউদ আলাইহিস সালাম, হযরত সুলাইমান আলাইহিস সালামও নিয়মতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং তা আদর্শিক মানে পরিচালনা করেছিলেন। যদি দেশ ও ধর্ম আলাদা হতো তাহলে এসকল নবী আলাইহিমুস্ সালামরা কেন ধর্মীয় বিধানে রাষ্ট্র পরিচালনা করলেন।
মদীনা সনদ থেকে জানা যায়,  যখন নবীজি মদীনা শরীফে আসলেন, দেখলেন তথায় বিভিন্ন সম্প্রদায়ের লোক বসবাস করছে। ১. মূর্তিপূজক সম্প্রদায়, ২. ইয়াহূদী সম্প্রদায়, ৩. খ্রিষ্টান সম্প্রদায় এবং ৪. মুসলিম সম্প্রদায়। এদের মাঝে একদিকে ছিল আদর্শিক অমিল আর অন্যদিকে ছিল পরস্পর বিরোধ ও বিবাদ। এতদ্বসত্তেও তিনি সকল ধর্ম ও গোত্রের মানুষদের মাঝে ঐক্যের বন্ধন সৃষ্টি করলেন। রচনা করলেন ঐতিহাসিক মদীনা সনদ। ইতিহাসবিদ ইবনে ইসহাকের মতে মদীনা সনদে মোট ৫০টি বিধান লিপিবদ্ধ করা হয়। তন্মধ্যে কয়েকটি উল্লেখ করছি।
১. মদীনা সনদে স্বাক্ষরকারী ইয়াহূদী, খ্রীষ্টান, পৌত্তলিক ও মুসলমান সম্প্রদায়সমূহ সমান নাগরিক অধিকার ভোগ করবে এবং তারা সবাই একটি সাধারণ জাতি বা উম্মাহ হিসেবে গণ্য হবে। 
২. হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নবগঠিত প্রজাতন্ত্রের প্রধান হবেন এবং পদাধিকর বলে তিনি মদীনার সর্বোচ্চ বিচারালয়ের সর্বময় কর্তা হবেন।
৩. পূর্ণ ধর্মীয় স্বাধীনতা বজায় থাকবে। মুসলমান ও অমুসলমান সম্প্রদায় বিনা দ্বিধায় নিজ নিজ ধর্ম পালন করবেন, কেউ কারো ধর্মে হস্তক্ষেপ করতে পারবে না।
আমার মনে হয়, মাত্র এ তিনটি ধারায় ইসলামী রাজনীতি বা ধর্ম ভিত্তিক রাজনীতি নিয়ে বর্তমান ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীদের অপপ্রচারের দুয়ার বন্ধ হয়ে যাবে। আর না হয় বলতে হবে, তারা এসকল বুঝে বিরোধীতা করছে, কারণ তারা ইসলামের বিরোধী। এছাড়া ধর্ম ও দেশকে পৃথক করার কোন যৌক্তিকতা নাই। আল্লাহ তায়ালা সবাইকে বুঝার তাওফিক দান করুক। 

No comments:

Post a Comment

ইসলামে রাজনীতি ও তাকওয়া

 ভূমিকা ইসলামে রাজনীতি ও রাজনীতিতে তাকওয়া বর্তমান প্রেক্ষাপটে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। বর্তমান দুনিয়ায় ‘ইকামতে দীন’ তথা আল্লাহর আইনপ্রতি...